২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে ৬৭.৫২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ি অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের ধস নেমেছে। সরকারি তথ্যমতে, এটি গত ৫০ বছরের মধ্যে উন্নয়ন কর্মসূচির সবচেয়ে দুর্বল বাস্তবায়ন। যদিও ২০২০-২১ অর্থবছরের পর এবারই মোট বরাদ্দের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে কম।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংশোধিত এডিপিতে নির্ধারিত ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি টাকা ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এডিপি বাস্তবায়নের হার কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই হার ছিল ৯২.৭৪ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০.৬৩ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৮.১৮ শতাংশে নেমে আসে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও কমে ৬৭.৫২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের গতি টানা পাঁচ বছর নিম্নমুখী।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্য খাত। এ খাতে ৩ হাজার ১২৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯৭৪ কোটি টাকা। ফলে অদক্ষতার কারণে এই খাতে ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা অলস পড়ে আছে। এছাড়া স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের বাস্তবায়নের হার ৩৬.৭২ শতাংশ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের হার ৩২.৪৫ শতাংশ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নের হার ৩২.৬৯ শতাংশ।
আইএমইডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ৮টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের এডিপি বাস্তবায়নের হার ৪০ শতাংশের নিচে। এর মধ্যে সংসদবিষয়ক সচিবালয় মাত্র ৭.৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে, যারা বরাদ্দকৃত ২০ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ১৫ হাজার টাকা ব্যয় করেছে। এছাড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের বাস্তবায়নের হার ১৩.৯৭ শতাংশ, যেখানে ৬৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের বাস্তবায়নের হার ১৭.৪২ শতাংশ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ২৯.৯০ শতাংশ।
আইএমইডির তথ্যমতে, অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ব্যয় হয়েছে ৪০ হাজার ৩০৮ কোটি ১২ লাখ টাকা, যা সংশোধিত এডিপির ১৯.২৯ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই মাসে ব্যয় হয়েছিল ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি ১০ লাখ টাকা বা ১৯.৯১ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের শেষদিকে ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা থাকলেও আগের বছরের তুলনায় তা কম ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিপি বাস্তবায়নের এই নিম্নহার সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো সম্পন্ন না হলে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, জ্বালানি, পরিবহণ ও স্থানীয় সরকার খাতের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আইএমইডির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রশাসনে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল, তার রেশ সদ্য বিদায়ি অর্থবছরেও বজায় ছিল। অনেক প্রকল্পের পরিচালক ও ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে যাওয়ায় উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভিন্ন কার্যক্রমের কারণে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর উন্নয়ন প্রকল্পে পর্যাপ্ত মনোযোগ ছিল না বলে মনে করা হচ্ছে।
এর পরে রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাস্তবায়নের হার ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ৬৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের বাস্তবায়নের হার ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। বরাদ্দ ৫৯৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১০৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের বাস্তবায়ন হার ২৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। ৫৫৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১৬৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।

