গত পাঁচ মাস ধরে আঞ্চলিক সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে আসছিল সৌদি আরব। এরই ধারাহিকতায় ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তিও হয়। সৌদি আরব একটি ঝড়ের কেন্দ্রে পড়ে যাওয়ায় তাদের সেই কৌশলটি এখন চরম সংকটে পড়েছে। এমনকি ইরানি ড্রোন তাদের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পরও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছিল রিয়াদ। তবে গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সৌদি আরবের জন্য সংযম দেখানোর সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই। ইরান এবং ইরাক ও ইয়েমেনে তেহরানের অনুগত গোষ্ঠীগুলোর ত্রিমুখী চাপের মুখে এখন দেশটি কোণঠাসা।
গত বুধবার ভোরের দিকে রিয়াদ পূর্ব ইরাকে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের অবস্থানে বড় ধরনের হামলা চালায়। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি ছিল একটি নিখুঁত ও সুনির্দিষ্ট অভিযান। তাদের দাবি, সৌদি আরব উত্তেজনা বাড়াতে চায় না, তবে যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে তারা বদ্ধপরিকর। পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্সেস জানিয়েছে, এই হামলায় তাদের বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যমতে, এটি ছিল ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নির্দেশে চালানো ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলার কড়া জবাব।
একই সময়ে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও জাহাজের ওপর হুতিদের হামলা রিয়াদের জন্য বড় উসকানি হিসেবে দেখা দিয়েছে। গত শনিবার জাজানে সৌদি আরবের দুটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুতিরা। পরবর্তী সময়ে এই সংঘাত বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দেয়। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও তা কখনোই পূর্ণাঙ্গ শান্তিতে রূপ নেয়নি। এর আগে তারা বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি জাহাজের চলাচলের ওপর অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানি করা তেলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই হুতিদের বাধার মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইয়ানবুর মতো বন্দরগুলোর মাধ্যমে তেল রপ্তানি সচল রাখার সৌদি পরিকল্পনা এখন চরম হুমকির মুখে।
২০১৫ সালে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করলেও সাত বছরেও রিয়াদ তাদের পুরোপুরি দমাতে পারেনি। যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও মে মাসে আরও কয়েকটি ড্রোন ছোড়া হয়। সৌদি কর্মকর্তারা ২০১৯ সালে আবকাইক শোধনাগারে চালানো সেই নিখুঁত ও ধ্বংসাত্মক হামলার কথা হয়তো ভুলে যাননি, যা দেশটির প্রায় অর্ধেক তেল উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছিল। হুতিরা সেই হামলার দায় স্বীকার করলেও ওই সময়ে গোয়েন্দা সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছিল, হামলাটি সম্ভবত ইরাক থেকে চালানো হয়েছিল। বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল বাশার মতে, হুতিরা উত্তর কোরিয়ার পথ অনুসরণ করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য বারবার উসকানিমূলক ঘটনা ঘটাচ্ছে। হোদেইদা বন্দরে সৌদি বিমান হামলার মাধ্যমে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা চললেও, দীর্ঘ উপকূল ও বিশাল তেল অবকাঠামো সুরক্ষায় রিয়াদের সামরিক সক্ষমতা বড় পরীক্ষার মুখে।
ইরান সরাসরি সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তু করা থেকে বিরত থাকলেও, আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন সৌদি কর্মকর্তাদের মধ্যে একধরনের গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে গিয়ে রিয়াদ যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার নীতি গ্রহণ করেছিল, তা এখন চরম সংকটে। যুদ্ধের প্রভাব ও স্থবির অর্থনীতি কাটিয়ে উঠতে সরকারি ব্যয় বাড়াতে গিয়ে দেশটি ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক ঘাটতির মুখে পড়েছে। সব মিলিয়ে, ২৮ ফেব্রুয়ারির তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি সৌদি আরবের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থিতিশীল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

