ওয়ার্নার হারজগের ‘বাকিং ফাস্টার্ড’: নিঃসঙ্গ দুই বোনের অদ্ভুত যাত্রা

ওয়ার্নার হারজগের চলচ্চিত্র ‘বাকিং ফাস্টার্ড’ শুরু হয় ডেভিড লিঞ্চের প্রতি উৎসর্গ দিয়ে। এই যাত্রায় বাস্তবতার মাটি থেকে সরে গিয়ে দুই বোনের এক সাধারণ আকাঙ্ক্ষার গল্প ফুটে ওঠে—কোথাও নিজেদের জন্য একটু জায়গা খুঁজে পাওয়া। জিন ও জোয়ান হলব্রুক নামের দুই বোনকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন কেট ও রুনি মারা। একই পোশাক এবং একই রকম চেহারার আড়ালে থাকা এই দুই নারীর মধ্যে এক গভীর নিঃসঙ্গতা কাজ করে, যা হারজগ ধীরে ধীরে উন্মোচন করেন।

গল্পের শুরুতে তাদের আদালতে দেখা যায়। প্রতিবেশী গ্যারেথ মুলরোনি (অরল্যান্ডো ব্লুম) তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। একসময়ের যৌন সম্পর্কের ভুল বোঝাবুঝি থেকে এই হয়রানির শুরু। দুই বোনের কাছে সেটি ছিল ভালোবাসা, কিন্তু মুলরোনির কাছে তা ছিল নিছক সম্পর্ক। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে তারা অশ্লীল শব্দ ব্যবহার এবং গাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো অপরাধে জড়ান। তবে ছবিটি তাদের অপরাধের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় তাদের ভেতরের শূন্যতার দিকে।

আদালতের পর মুলরোনি দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যান এবং গল্পের মোড় ঘোরে। সহৃদয় প্রতিবেশী মি. ওয়েস্টমোরল্যান্ড তাদের একটি ফ্ল্যাট ব্যবহারের সুযোগ দেন। এরপর সমাজকর্মী টিমোথি (ডমহনাল গ্লিসন) তাদের জীবনে প্রবেশ করেন, যিনি মাদকাসক্তি থেকে ফিরে আসা একজন মানুষ। তিনি দুই বোনের পরস্পরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভাঙার চেষ্টা করেন। কিন্তু জীবন সমাজকর্মীর কোনো পরিকল্পনা মেনে চলে না। তারা যেন একজন মানুষ হয়ে বাঁচতে চান, অথচ পৃথিবী তাদের আলাদা সত্তা হিসেবেই দেখতে চায়। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, সার্ডিনের টিন কিংবা সিনেমা হলে যাওয়ার ভয়ের মতো ছোট ছোট বিষয়ে তাদের অসামঞ্জস্যতাগুলো ফুটে ওঠে।

টিমোথি তাদের বাইরে বের হওয়ার পরামর্শ দিলে তারা সিনেমার অন্ধকার ঘর কিংবা রেস্তোরাঁর ওয়েটারদের ভয় পায়। এই হাস্যকর পরিস্থিতির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নীরবতা—তারা জানেন না কীভাবে অন্যদের পৃথিবীতে প্রবেশ করতে হয়। আদালতের ঘটনার পর তারা ইন্টারনেটের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন, এমনকি তাদের নগ্ন ছবিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু দুই বোন তা বিশ্বাস করতে অস্বীকার করেন, কারণ তাদের বাড়িতে ইন্টারনেটই নেই। এই সরল অস্বীকার আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে তাদের বিচ্ছিন্নতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

রুনি মারার সংযত অভিনয় দুই বোনের ছোট পৃথিবীকে ফুটিয়ে তোলে। তার মুখে প্রায় কোনো অতিরিক্ত অভিব্যক্তি নেই, অথচ সেই স্থিরতার ভেতরেই বোঝা যায় তাদের পৃথিবী কতটা ছোট। তারা ভালোবাসা চায় কিন্তু তার ভাষা জানে না, মানুষের কাছে যেতে চাইলেও তাদের ভয় পায়। এক পর্যায়ে তারা একটি বিয়েতে অনাহূত অতিথি হিসেবে হাজির হন, যেখানে হাসির চেয়ে অপমানের নিঃশব্দতা বেশি অনুভূত হয়। পারিবারিক বাড়িতে ফিরে গিয়েও তারা দরজা খোলার অনুমতি পান না। শেষ পর্যন্ত আন্টি লুইসের চিঠিতে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে অর্কনি দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত সুড়ঙ্গ খোঁড়ার নতুন স্বপ্নে তারা মত্ত হন।

ছবির শেষ আধঘণ্টায় গল্পটি কিছুটা দিকভ্রান্ত হলেও এর ভেতরে একটি কোমল জায়গা রয়ে গেছে। হারজগ দুই বোনকে নিয়ে হাসেন কিন্তু তাদের প্রতি নিষ্ঠুর হন না। তাদের অদ্ভুততা কখনো বিরক্তিকর হয়ে উঠলেও তিনি তাদের অপমান করেন না। বরং তাদের সেই অসম্ভব ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষাকে তিনি বিশ্বাস করেন। পৃথিবী তাদের জায়গা না দিলেও, তারা খুঁজে যায়। মানুষ শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছাবে তা না জানলেও, কখনো শহরে, কখনো পুরোনো বাড়িতে, আবার কখনো মাটির নিচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে সেই জায়গা খোঁজার চেষ্টা করে। ‘বাকিং ফাস্টার্ড’ সেই অসম্পূর্ণ চেষ্টারই এক অদ্ভুত ও মায়াময় গল্প।