হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল ও ভয়ঙ্কর আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালান নেটওয়ার্ক। গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অনুসন্ধানে এই চক্রের চাঞ্চল্যকর ছক এবং নেপথ্যের মূল গডফাদারদের একাংশের নাম উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আকাশপথে আসা সোনা ঢাকার মাটি ছুঁয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে সড়কপথে সীমান্ত পেরিয়ে চলে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রায় অর্ধশত প্রভাবশালী মাফিয়া ডন এই পুরো সিন্ডিকেটের কলকাঠি নাড়ছে। এই চক্রটির কার্যক্রম কর্পোরেট চেইনের মতোই সুসংগঠিত। দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবের বিভিন্ন জুয়েলারি ব্যবসার আড়ালে থাকা এই মাফিয়ারা মূল অর্থায়ন, পরিকল্পনা ও সোনার জোগান নিশ্চিত করে। তাদের অধীনে থাকা শতাধিক দেশীয় এজেন্টরা মূলত এই চোরাচালানের মাঠ পর্যায়ের কাজ সামলায়। ভারতের চোরাই সোনার বাজারের বিশাল চাহিদাকে পুঁজি করেই তারা শাহজালাল বিমানবন্দরকে তাদের প্রধান ‘ট্রানজিট হাব’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
এই নেটওয়ার্কের ভেতরে বিমানবন্দরের অসাধু সহযোগীদের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া কাজ চালানো অসম্ভব। সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস, বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং স্টাফ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একটি অংশ বেতনভুক্ত এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। কড়া নজরদারির মধ্যেও সিসিটিভি ক্যামেরা ফাঁকি দিয়ে এবং কোন পথে সোনা পার করতে হবে তা তারাই ঠিক করে দেয়। সম্প্রতি বিমানবন্দর থানা ও এপিবিএনের বিশেষ অভিযানে নাসির মোল্লা (৪০), সোহাগ শেখ (২৪) এবং হাছান মিয়া (২৩) নামে তিন সক্রিয় ক্যারিয়ার বিপুল পরিমাণ সোনাসহ গ্রেপ্তার হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের ক্যারিয়ার ও রিসিভার হিসেবে কাজ করার কথা স্বীকার করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে শাহজালাল বিমানবন্দর থানায় সোনা চোরাচালানের দায়ে ৫৫০টি মামলা হয়েছে, যেখানে ৪৯০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি এবং ২০২৫-২৬ মেয়াদে এখন পর্যন্ত ৯২টি মামলা দায়ের হয়েছে। কাস্টমসের তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে শতাধিক অভিযানে প্রায় ২ হাজার কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬৯৭ কেজি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৪ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১৭ কেজি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৮ কেজি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৮ কেজির কিছু বেশি সোনা জব্দ হয়েছে। একই সময়ে বৈধভাবে আমদানি করা সোনা থেকে ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে মামলার আলামত হিসেবে ২ হাজার ১১১ কেজি সোনার বার এবং ৮১৯ কেজি স্বর্ণালংকারসহ মোট ২ হাজার ৯৩০ কেজি সোনা জমা রয়েছে।
তদন্তকারীদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত ব্যাগ বা বিমানের টয়লেট থেকে সোনা উদ্ধারের সময় সুনির্দিষ্ট কাউকে শনাক্ত করা যায় না বলে মামলাগুলোতে অজ্ঞাতনামা আসামি দেখানো হয়। এছাড়া সিন্ডিকেটগুলো নতুন বাহক নিয়োগের চেয়ে পুরনো ও বিশ্বস্ত ক্যারিয়ারদেরই বারবার ব্যবহার করে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী নরসিংদীর আনোয়ার, শরীয়তপুরের হান্নান শিকদার ও মুন্সিগঞ্জের জুমন, সৌদিতে থাকা কুমিল্লার সাইফুল এবং দুবাইয়ে সক্রিয় শওকত, মোস্তফা, নোমান ও নজরুলের মতো মাফিয়ারা এখন পুলিশের নজরদারির তালিকায় রয়েছে। বিদেশে অবস্থানকারী এই মাফিয়ারা নিজ নিজ এলাকায় আলাদা চক্র গড়ে তুলে বিভিন্ন জুয়েলারির দোকানে সোনা বিক্রি করছেন অথবা প্রতিবেশী দেশে পাচার করছেন।

