দেশের শিল্প-কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ আজ মঙ্গলবার রাত থেকেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ আশ্বাস দেন। তিন ঘণ্টাব্যাপী এই সভায় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটকে ‘উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি না করে সরকারকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া উচিত। সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও গণমাধ্যমের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল, যার প্রভাব পড়েছিল শিল্পখাতে। তবে সেই কারিগরি ত্রুটি ইতিমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই গ্যাসের সরবরাহ এক-দেড় মাস আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। এছাড়া সংকট মোকাবিলায় জিটুজি ভিত্তিতে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহ্দী আমিন জানান, জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করতে সচল দুটি টার্মিনালের পাশাপাশি ২০২৮ সালের আগে তৃতীয়টি এবং দীর্ঘমেয়াদে পাঁচটি এফএসআরইউ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া মধ্যমেয়াদে দেশের ভেতরে প্রায় ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খনন করা হবে এবং সফল হলে দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ১৫০টি কূপ খনন করা হবে। ল্যান্ড-বেসড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং জাতীয় গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্ক সুদৃঢ় করার উদ্যোগও চলমান রয়েছে।
মতবিনিময় সভা শেষে এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক জানান, ব্যবসায়ীরা সরকারের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় আশ্বস্ত হয়েছেন। সভায় নিটওয়্যার খাতের টেকসই বিকাশে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৬ দফা প্রস্তাব পেশ করেন। এর মধ্যে রয়েছে- অর্থ, বাণিজ্য, শ্রম মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের নীতি নির্ধারণী কমিটি গঠন, বাস্তবসম্মত ফায়ার কোড প্রবর্তন, জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান, অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে নীতি প্রণয়ন, এনবিআর-এর সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড সংশোধন।
অন্যদিকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ক্রেতাদের আশ্বস্ত করার জন্য গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কাস্টমসের ফাইল সচল রাখার দাবি জানান। বিদ্যুৎ খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকারের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভোলায় নতুন ১৯৫ মেগাওয়াট গ্যাসচালিত কেন্দ্র চালু এবং ১৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পর্যালোচনা করে ৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করার তথ্য জানানো হয়। এছাড়া চুক্তি শেষ হওয়া কেন্দ্রগুলোতে ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের মধ্যমমেয়াদি পরিকল্পনায় বড়পুকুরিয়া, পায়রা ও মাতারবাড়িতে নতুন বেজ-লোড বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, গ্রিড আধুনিকায়ন, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ (বিইএসএস) স্থাপন, কয়লা উত্তোলন, পিপিপি মডেলে সৌরকেন্দ্র স্থাপন এবং স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার বসানোর কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৪০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবেশসম্মত প্রযুক্তিতে দেশীয় কয়লা উত্তোলন এবং নিউক্লিয়ার উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে দেশের সম্ভাব্য বিদ্যুৎ চাহিদা ধরা হয়েছে ৩৮ থেকে ৪০ হাজার মেগাওয়াট।
এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় সরকারের পক্ষে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার উপস্থিত ছিলেন। ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে মাহবুবুর রহমান (আইসিসি-বি), আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (বিসিআই), কামরান টি. রহমান (এমসিসিআই) সহ বিভিন্ন খাতের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, শফিকুল আলম, আশরাফ কায়সার, মোস্তাফা ফিরোজ, আব্দুন নূর তুষার প্রমুখ।

