পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ ও এমডি ছাড়াই চলছে দেশের বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক

দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি বর্তমানে এক বড় ধরনের প্রশাসনিক ও নীতিগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকটিতে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নেই, পাশাপাশি নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ। দুই পক্ষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগ আটকে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে ব্যাংকটির দৈনন্দিন পরিচালনা ও বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ ও করপোরেট গ্রাহকদের ওপর।

ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকে এমডির পদ শূন্য হওয়ার পর তিন মাসের মধ্যে তা পূরণ করা বাধ্যতামূলক। তবে ইসলামী ব্যাংকের নিয়মিত এমডির পদটি প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে শূন্য পড়ে আছে। এর আগে দায়িত্বে থাকা এমডি ওমর ফারুক খানকে গত ১৩ এপ্রিল তৎকালীন পর্ষদ ছুটিতে পাঠায়। ছুটি শেষে তিনি আর ব্যাংকে যোগ দিতে পারেননি এবং পরবর্তী সময়ে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে ভারপ্রাপ্ত এমডি দিয়ে ব্যাংকের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা স্পষ্টতই নিয়মের লঙ্ঘন। আইন অনুযায়ী, এমডি পদ তিন মাসের বেশি শূন্য থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেখানে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে। তবে বর্তমানে ব্যাংকটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকায় নতুন করে প্রশাসক দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ইসলামী ব্যাংকের এই সংকটের শুরু মূলত গত মে মাস থেকে। ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। ওই রাতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু জুনের শুরু থেকেই ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের বিক্ষোভ, আন্দোলন এবং ব্যাপক হারে আমানত তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটে, যা ব্যাংকটিকে তীব্র তারল্য সংকটে ফেলে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৭ হাজার কোটি টাকার বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দিলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। অবশেষে গত ১৪ জুন ব্যাংকের পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. জহির হোসেনকে পর্ষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত তিন মাস ধরে তিনি ব্যাংকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বে থাকলেও পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এ বিষয়ে জহির হোসেন জানান, ব্যাংকের কোনো পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ নেই এবং তিনি পর্ষদের একটি অংশ মাত্র। বড় সিদ্ধান্তগুলোর জন্য পূর্ণাঙ্গ পর্ষদের প্রয়োজন হয়।

এস আলম গ্রুপের আমলের নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, যা কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগের বিষয়টি পর্ষদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকায় ভারপ্রাপ্ত এমডিসহ আটজন শীর্ষ কর্মকর্তার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন আটকে রয়েছে। ইতিমধ্যে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদারের মেয়াদ গত ১১ সেপ্টেম্বর এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব আলম ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিনুর রহমানের মেয়াদ ৯ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তাদের পুনর্নিয়োগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ব্যাংক সূত্র জানায়, আট কর্মকর্তার পুনর্নিয়োগের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যদিও স্বাভাবিক নিয়মে বোর্ডের অনুমোদনই যথেষ্ট ছিল। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছিল এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্যোগে আমানত উত্তোলন বন্ধ হয়েছিল। তবে বর্তমানে ব্যাংকটিতে নতুন কোনো ব্যবসায়িক অগ্রগতি নেই, কেবল আমানত সংগ্রহের কাজ চলছে। অন্যদিকে, ব্যাংকটির এই অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে করপোরেট গ্রাহকদের ওপর। ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের শত শত পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা, এলসি খোলা বা চলতি মূলধন পাচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বড় শিল্পোদ্যোক্তা জানান, তার চারটি তৈরি পোশাক কারখানায় চার হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেন, যাদের বেতন ও এলসি এই ব্যাংকের মাধ্যমে হয়। ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ায় শ্রমিকদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে শ্রমিক অসন্তোষ ও সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

ব্যাংকটির করপোরেট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বড় বড় ঋণ নবায়ন, সীমা বাড়ানো বা নতুন ঋণ সুবিধার প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পর্ষদের প্রয়োজন হয়, যা এখন বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের অস্থিরতার খবর বিদেশি ব্যাংকগুলোর কাছে পৌঁছানোয় এলসি খোলার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই অস্থিরতার বড় ধাক্কা লেগেছে ব্যাংকের আমানতে, যা ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ১ লাখ conci১ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। এছাড়া জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৫২ শতাংশ এবং দেশের ব্যাংকিং খাতের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, তিন মাসের বেশি এমডি পদ শূন্য রাখার নিয়ম না থাকলেও যৌক্তিক কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময় বাড়াতে পারে। বর্তমানে যোগ্য লোক খোঁজা হচ্ছে এবং পেলেই পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠন করা হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকে নেতৃত্ব শূন্যতা থাকলে গ্রাহকদের আস্থা কমে যায়। বিশেষ করে করপোরেট গ্রাহকরা দ্রুত সেবা না পেলে বিকল্প ব্যাংকের দিকে চলে যেতে পারেন, যা ইসলামী ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

সরকারি চাকরিবিধি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত চাকরির বয়সসীমা ৬০ বছর পর্যন্ত। আর ৬৫ বছর পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত থাকতে পারে।

ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে নানা ধরনের পরিকল্পনা হাতে নেয়। যেসব পরিকল্পনা শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বাস্তবায়ন শুরু করে। এতে ব্যাংকটি অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়।