দীর্ঘ ১৬ বছর পর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অংশীদারিত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ভৌগোলিক নৈকট্য, স্থলপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা এবং তুলনামূলক কম খরচের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অবস্থান দ্বিতীয় থাকলেও, এবার তাকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানটি দখল করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, বড় ব্যবধানে নিজের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চীন। এই পরিবর্তনের পেছনে কেবল আমদানি-রপ্তানির হিসাবই নয়, বরং কাজ করেছে ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণ, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানসম্পন্ন পণ্য পাওয়া গেলেও এর ফলে সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৬৭ কোটি ডলার। বিপরীতে ভারতের সঙ্গে এই বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭২ কোটি ডলার। অর্থাৎ, ভারতের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ১৯৫ কোটি ডলার বেশি হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বৃদ্ধির ফলেই দেশটির সঙ্গে মোট বাণিজ্য বেড়েছে, যার বড় অংশই হয়েছে সরকারি কেনাকাটার মাধ্যমে। তবে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত বিশেষ শুল্কসুবিধা এখনও কার্যকর হয়নি।
একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। দেশটি থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার চেয়ে অনেক বেশি পণ্য সেখানে রপ্তানি করে থাকে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় ধরনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৬২৬ কোটি ডলার, যা পরবর্তী অর্থবছরে আমদানি বাড়ার কারণে কিছুটা কমে ৫৫৫ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করেছে ৯১১ কোটি ডলারের, বিপরীতে আমদানি করেছে ৩৫৬ কোটি ডলারের পণ্য।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে দুই দেশের মধ্যে পাল্টা শুল্ক নিয়ে আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি কমানোর নীতির অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন। কয়েক দফা আলোচনার পর এই শুল্কহার ২০ শতাংশ নির্ধারিত হয় এবং তা ৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। অবশ্য এর আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে একটি পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি সই হয়। চুক্তিতে পাল্টা শুল্ক ১৯ শতাংশে নামানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য, ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য, ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার অঙ্গীকার করে। এর ধারাবাহিকতায় গত ৩০ এপ্রিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই করে। পরবর্তীতে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়েও সরকারি পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।
বাণিজ্যচুক্তির বাস্তবায়ন পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য কেনা বাড়িয়ে দেয়। সরকারি পর্যায়ে গম ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং বেসরকারি পর্যায়ে সয়াবিনবীজ ও তুলা আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো গম আমদানি না হলেও গত অর্থবছরে ২২ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের গম এসেছে। একই সময়ে সয়াবিনবীজ আমদানি ৩৫ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৬২ কোটি ডলারে এবং তুলা আমদানি ২৩ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৩৮ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া সরকারি খাতে এলএনজি আমদানি হয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি ডলারের। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি ৪৩ শতাংশ বেড়ে ২৪৯ কোটি থেকে ৩৫৬ কোটি ডলারে উঠেছে, যেখানে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আগের অর্থবছরের ১৪ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানিকারক মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে বাণিজ্যসুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পণ্যের মান বিবেচনায় দামও বেশ প্রতিযোগিতামূলক ছিল। একই ধরনের মত প্রকাশ করে সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের মান ভালো এবং সরবরাহের নিশ্চয়তা বেশি। অন্যদিকে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইউক্রেনসহ কয়েকটি দেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বন্দর ব্যবহারের ঝুঁকি ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়ায় তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়লেও ভারতের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। গত অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি কমেছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ এবং রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ। রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ এই পতনে ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ সরকার ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। এর জবাবে ৮ এপ্রিল কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশের পণ্য তৃতীয় দেশে রপ্তানির সুবিধা প্রত্যাহার করে ভারত। এছাড়া ভারতও তিন দফায় বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। গত ১৭ মে ও ২৭ জুন পোশাক, খাদ্যপণ্য, পাটপণ্য, তুলা ও সুতার বর্জ্য, প্লাস্টিক এবং কাঠের আসবাব রপ্তানিতে বিভিন্ন শর্ত দেওয়া হয়। পরে ১১ আগস্ট আরও কিছু পাটপণ্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে দেশটি।
এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে ভারতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১২ শতাংশ কমে ৬৫ কোটি ডলার থেকে ৫৭ কোটি ডলারে নেমেছে। একই সময়ে ভারত থেকে তুলা আমদানি ৫২ কোটি থেকে ২৩ শতাংশ কমে ৪০ কোটি ডলারে এবং তুলার সুতা ১৭৫ কোটি থেকে কমে ১৪৭ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে মোট ৮৯৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে এবং মোট বাণিজ্য ৭৭ কোটি ডলার কমে ১ হাজার ৭২ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, বাংলাদেশ আমদানি বাড়ানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি কমছে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের আশঙ্কা হ্রাস করবে। তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে শুল্কছাড় কার্যকরের চেষ্টা চলছে এবং সেপ্টেম্বর মাসে এই সুবিধার কাঠামো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমার বিষয়ে তিনি বলেন, পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়লে উভয় দেশই লাভবান হবে।
এদিকে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে চীন। গত অর্থবছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্য হয়েছে ২ হাজার ২৯৬ কোটি ডলারের, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের চেয়ে প্রায় ৮১ শতাংশ বেশি। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য মূলত আমদানিনির্ভর, যেখানে আমদানি হয়েছে ২ হাজার ২১৪ কোটি ডলারের এবং রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৮২ কোটি ডলারের পণ্য। এনবিআরের হিসাবে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৩১২ কোটি ডলার এবং রপ্তানি ছিল ৪ হাজার6২৬ কোটি ডলার। মোট ১১ হাজার ৯৩৮ কোটি ডলারের পণ্য বাণিজ্যের মধ্যে চীনের অংশ ১৯ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের ১১ শতাংশ এবং ভারতের ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, এই তিন দেশের সঙ্গেই হয়েছে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ।

