মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পেট্রোবাংলাকে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। এই অব্যাহত উচ্চমূল্যের আমদানির ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের অর্থসংকটে পড়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে অর্থ বিভাগ পেট্রোবাংলার অনুকূলে জরুরি ভিত্তিতে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদানের সুপারিশ করেছে। এই অর্থ মূলত চলতি জুলাই মাসের শেষ ১৫ দিনের আমদানির জন্য প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট নথিতে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে যে, সময়মতো এই অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব না হলে বিদেশি এলএনজি সরবরাহকারীরা কার্গো পাঠাতে অনাগ্রহী হতে পারে, যা দেশে জ্বালানি সরবরাহ চেইনকে ঝুঁকিতে ফেলবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক করেছেন। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন না ঘটাতে এলএনজি আমদানির অর্থায়ন দ্রুত নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, বাজার পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে চলতি অর্থবছরে কেবল এলএনজি আমদানিতেই অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে, যা বাজেট ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আগে এলএনজি পাওয়া গেলেও বর্তমানে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। আগে একটি কার্গো আমদানিতে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও এখন তা ৬৫০ থেকে ৯৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
অর্থ বিভাগের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত সময়ে সরবরাহকৃত এলএনজির বিপরীতে পেট্রোবাংলার প্রাক্কলিত ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দকৃত দুই হাজার ২৫০ কোটি টাকার মধ্যে ইতিমধ্যে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অপ্রতুল। জুলাইয়ের প্রথমার্ধে পাঁচটি কার্গোর বিল পরিশোধ না হওয়ায় ঘাটতি প্রায় এক হাজার ৫৯৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, স্বল্পমেয়াদে সরকারকে এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হলেও দীর্ঘমেয়াদে শুধু ভর্তুকির ওপর নির্ভর করা সমাধান নয়। তিনি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, গভীর সমুদ্রে কার্যক্রম জোরদার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরেই ভর্তুকি কমিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করে আসছে।
কথা হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার দ্রুত কিছু কাজ করতে চায়। এলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাজার পরিস্থিতি এরকম থাকলে চলতি অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানিতেই অতিরিক্ত ১৫-২০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এতে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হবে।
এর আগে মে ও জুন মাসে নির্ধারিত কার্গোর বাইরে অতিরিক্ত পাঁচটি এলএনজি কার্গো আমদানি করতে হয়েছে। ১ থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে আরও পাঁচটি কার্গো দেশে এসেছে, যেগুলোর বিল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করলে ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সরকারি হিসাবে দেখা গেছে, গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করা হলেও প্রত্যাশিত রাজস্ব আয় হয়নি। বিক্রয় কাঠামোর পরিবর্তন এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির কারণে জুলাইয়ের প্রথমার্ধেই প্রায় ১৯০ কোটি টাকা কম আয় হয়েছে। ফলে ওই সময়ের পাঁচটি এলএনজি কার্গোর বিপরীতে ঘাটতি বেড়ে প্রায় এক হাজার ৫৯৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

