আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে তিন বছরে ৯৬৯৭ কোটি টাকার অনিয়ম

সরকারি মালিকানাধীন আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের (এপিএসসিএল) গত তিন অর্থবছরের নিরীক্ষায় ৯ হাজার ৬৯৭ কোটি ৫০ লাখ ৭০ হাজার ৪৩৫ টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দেশের সবচেয়ে বড় এই পাওয়ার হাবে ৬টি ইউনিটের মাধ্যমে ১৬৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। ২০২২-২০২৩, ২০২৩-২০২৪ এবং ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের হিসাব সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স অডিট কার্যক্রম গত বছরের ২৪শে আগস্ট থেকে ২৫শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সম্পন্ন হয়। এ বছরের ১৪ই জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অডিট অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নিজাম খান এই অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্ট ইস্যু করেন। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দেয়া চিঠিতে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে উত্থাপিত ৪৫টি অডিট মেমোর বিপরীতে প্রমাণকের ভিত্তিতে ৪৫টি অনুচ্ছেদে রূপান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি অনুচ্ছেদকে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম (এসএফআই) এবং ১০টি অনুচ্ছেদকে সাধারণ অনুচ্ছেদ (নন-এসএফআই) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গুরুতর আর্থিক অনিয়মসমূহের প্রথম অনুচ্ছেদে সাবসিডিয়ারি কোম্পানি থেকে শেয়ার ডিভিডেন্ড কম আদায় করায় ১১৪ কোটি ১ লাখ ৫ হাজার ১১ টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা বলা রয়েছে। ২০১৩ সালে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি (এপিএসসিএল), ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড এবং ইউনাইটেড আশুগঞ্জ এনার্জি লিমিটেডের (ইউএ-ইএল) মধ্যে শেয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়। এতে এপিএসসিএল ২৯ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা লাভ করে। কিন্তু ইউনাইটেড তাদের ঘোষিত শেয়ার ডিভিডেন্ডের ৭.৫৯৩ শতাংশ শেয়ার অনুপাতে লভ্যাংশ প্রদান করে। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত ইউনিট ১ ও ২ বিক্রয়ে অ্যাসেট ভ্যালুয়েশন করার সময় স্যালভেজ ভ্যালু থেকে অস্বাভাবিক কম মূল্য হিসাব করায় ৪২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (ইস্ট) বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগেই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ২০২৩ সালের মে মাসে কেন্দ্রটি ফোর্স শাটডাউন করা হয়। কিন্তু ত্রুটি সংশোধনের জন্য ইপিসি ঠিকাদার থেকে অর্থ আদায় না করে কোম্পানির তহবিল থেকে ১০৯ কোটি ৬২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের আওতাধীন পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টের ভূমি অধিগ্রহণ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ প্রকল্পে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান না হওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারের সঙ্গে ডিপিএম পদ্ধতিতে চুক্তি সম্পাদন করায় ৩৯০ কোটি ৭৮ লাখ ৭২ হাজার ১১৮ টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ডের মধ্যে প্লান্টের আউটেজ আওয়ার চুক্তির শর্তের অধিক হওয়া সত্ত্বেও ক্ষতিপূরণ আদায় না করায় ১১১ কোটি ৫৯ লাখ ৭২ হাজার ৭৪১ টাকা ক্ষতি হয়েছে। প্লান্টের অ্যানুয়েল ডিপেন্ডেবল ক্যাপাসিটি কম ঘোষণা করায় রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ৮ কোটি ৮৩ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৯ টাকা। এছাড়া অতিরিক্ত আউটেজ-এর কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কোম্পানির রাজস্ব আয়জনিত আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬৯৮ কোটি ৯২ লাখ ৪ হাজার ৭৪০ টাকা।

চাহিদা ছাড়া প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্যাস বুস্টার কম্প্রেসার ক্রয় করায় ৫৪ কোটি ৬৮ লাখ ৮৭ হাজার ৩৭১ টাকা ক্ষতি হয়েছে। বিপিডিবি’র কাছে বিদ্যুৎ বিক্রয় বাবদ বকেয়া নির্ধারিত সময়ে আদায় না করায় ৫ হাজার ৬৬০ কোটি ২৯ লাখ ২৭ হাজার ২৪৮ টাকা এবং গ্যাস কনসাম্পশন অনুসারে বিল না করে বিপিডিবি থেকে নির্ধারিত হিট রেট অনুসারে গ্যাস বিল আদায় করায় ৬৩ কোটি ৮১ লাখ ৩৫ হাজার ৬২০ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টে ব্যর্থ ঠিকাদারের কাছ থেকে বিলম্ব জরিমানা (এলডি) কর্তন না করে বিল পরিশোধ করায় ৩৮ কোটি ৬৪ লাখ ২৯ হাজার ৪৯২ টাকা এবং সরকারের শেয়ার মালিকানা বাবদ ঘোষিত ডিভিডেন্ড পরিশোধ না করায় ৩ কোটি ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৫ টাকা ক্ষতি হয়েছে। পুনর্বাসনের নিমিত্তে নির্মিত ঘরের ছাদে প্যাটেন স্টোন ও জানালার থাই গ্লাসের কার্যসম্পাদন না করা সত্ত্বেও বিল পরিশোধ করায় সরকারের ২ কোটি ২৯ লাখ ১৭ হাজার ২২৮ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) অনুযায়ী পাওয়ার প্লান্টের বীমা না করায় প্রিমিয়াম ও ভ্যাট বাবদ সরকারের ১৪ কোটি ৭৯ লাখ ১০ হাজার ১২৫ টাকা ক্ষতি হয়েছে। অর্থ বিভাগের ছাড়পত্র ব্যতীত ডিপিপি প্রণয়ন না করেই প্রকল্পের বিপরীতে ২ কোটি ৭৯ লাখ ৯৪ হাজার ৪৫৯ টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। প্লান্ট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কর্মচারীদের ওভারটাইম অ্যালাউন্স প্রদান করায় ১ কোটি ৬১ লাখ ৩১ হাজার ১৭ টাকা এবং আবাসিক স্থাপনায় একক মিটারের মাধ্যমে কোম্পানির তহবিল থেকে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করায় ৯ কোটি ৪৮ লাখ ৪৪ হাজার ৮২৭ টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। বিভিন্ন কর্মকর্তাকে প্রদত্ত সাময়িক আগাম নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও সমন্বয় না করায় ৭ কোটি ৯২ লাখ ৮০ হাজার ৯৮১ টাকা ক্ষতি হয়েছে। পটুয়াখালী প্রকল্পে দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় প্রস্তুত কমিটি গঠন ব্যতিরেকে দরপত্র প্রস্তুত করে চুক্তি স্বাক্ষর করায় ৯৬ কোটি ৪৭ লাখ ৬১ হাজার ৯৯১ টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। অবসর ঘোষিত বন্ধ প্লান্টের জন্য মালামাল ক্রয় করায় ২০ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার ৪৭৫ টাকা এবং প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে অত্যধিক নিম্নদরে কার্যাদেশ প্রদান করায় ৩ কোটি ৬৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮৮২ টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে।

প্রতিবেদনের সার সংক্ষেপে বলা হয়, ডিফেক্ট সার্ভিস লায়াবিলিটি পিরিয়ডের মধ্যে পিজি (পারফরম্যান্স গ্যারান্টি) বাজেয়াপ্ত না করায় ১৪৮ কোটি ৪৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯১ টাকা ক্ষতি হয়েছে। নিলাম দরপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতাকে বিক্রয়াদেশ ইস্যু না করায় ২৪ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং বিলম্ব জরিমানা আদায় না করায় ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। আউটসোর্সিং কর্মচারীদের সেবামূল্য সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পরিশোধ না করে ঠিকাদারকে পরিশোধ করায় ৭ কোটি ৩২ লাখ ৩২ হাজার ৭১৫ টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। করপোরেট অফিসের জন্য সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে অধিক হারে অফিস ভাড়া করায় ১৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯৬৬ টাকা এবং প্রাধিকার প্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার করায় ৩১ লাখ ৭০ হাজার ৪৪০ টাকা ক্ষতি হয়েছে। ‘কাজ নাই মজুরি নাই’ ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ করে মজুরি পরিশোধ করায় ৭ কোটি ২০ লাখ ৩৯ হাজার ৩২৯ টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে।

পটুয়াখালী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টে আরডিপিপি মোতাবেক কাজ সম্পাদন না করা সত্ত্বেও প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা করে পিসিআর প্রস্তাবের মাধ্যমে অনিয়ম করা হয়েছে। মালামাল সরবরাহ না করা সত্ত্বেও বিল পরিশোধ করায় ২২ লাখ ৮১ হাজার ৫৪৯ টাকা এবং বিভিন্ন প্লান্ট মেরামত ও এলটিএস চুক্তির বিপরীতে মালামাল গৃহীত না হওয়া সত্ত্বেও অর্থ পরিশোধ করায় ৮৪ কোটি ৮৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৫৪ টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। কন্ট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ড ফান্ডে (সিপিএফ) নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত কন্ট্রিবিউশন প্রদানের ফলে ২ কোটি ৭৫ লাখ ৭৯ হাজার ৯৪৮ টাকা এবং নিম্নস্তরের বাসা বরাদ্দ দিয়ে কম বাসা ভাড়া আদায় করায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৯৮ হাজার ৪০০ টাকা ক্ষতি হয়েছে। অর্থ বিভাগের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে অনুমোদিত টিওঅ্যান্ডই ব্যতিরেকেই পদ সৃজন ও যানবাহন সরঞ্জামাদির সংস্থান করায় অনিয়ম হয়েছে। গুরুতর আর্থিক অনিয়মে জড়িত টাকার পরিমাণ ৭ হাজার ৬৯৭ কোটি ১১ লাখ ৭০ হাজার ৮৩৪ টাকা। সাধারণ অনিয়মগুলোর মধ্যে পটুয়াখালী প্রকল্পে ফিজিবিলিটি স্টাডি না করেই ডিপিপি প্রণয়ন করায় ৬৩৭ কোটি ২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। প্লান্টের জেনারেশন চালু না রাখায় ৮২ কোটি ১৯ লাখ টাকা এবং অব্যবহৃত গ্যাস বুস্টার কম্প্রেসার স্টোর ইনভেন্টরি প্রতিবেদনে হিসাবভুক্ত না করায় ৫৪ কোটি ৬১ লাখ ৮৭ হাজার ৩৭১ টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। এছাড়া উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করায় ৮ হাজার ৬৮৬ কোটি ৬২ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৭ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তদারকির অভাবে কোম্পানির জমিতে বহিরাগত প্রতিষ্ঠানের তেলের ডিপো নির্মাণ করে ভূমি বেদখল হয়েছে। পিপিআর, ২০০৮-এর শর্ত পরিপালন না করে আরএফকিউ পদ্ধতিতে সিলিং সীমার অতিরিক্ত ১ কোটি ১৬ লাখ ১৯ হাজার ৭১৮ টাকা এবং ১ কোটি ৯ লাখ ৭ হাজার ৮৩৪ টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। ভেন্ডর এগ্রিমেন্ট লঙ্ঘন করে তৃতীয় পক্ষকে জমি লিজ প্রদান বাবদ ৩০ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকার অনিয়মিত চুক্তি হয়েছে। পরিবহন পুলে গাড়ি থাকা সত্ত্বেও ভাড়াকৃত গাড়ি ব্যবহার করায় ২ কোটি ৫৪ লাখ ৮০ হাজার ৮০ টাকা এবং বাসা বরাদ্দ না দেয়ায় বাসা ভাড়া বাবদ ১ কোটি ৮৪ লাখ ১৫ হাজার ৮০৫ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

অডিট রিপোর্ট নিয়ে কথা বলতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সানাউল হকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (এইচআর ও প্রশাসন) মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খানও সাড়া দেননি। কোম্পানির পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. সবুর হোসেন বলেন, অডিট রিপোর্টে কি আছে আমি দেখি নাই। অডিট এবং তাতে কোনো অসঙ্গতি আছে কিনা তা আমাকে বলেনি। তবে ইউনাইটেড পাওয়ারের শেয়ার নিয়ে একটি বিষয় আমার নলেজে আছে। আমরা ২৯ শতাংশ শেয়ার পাওয়ার কথা থাকলেও পেয়েছি ৭ শতাংশ। আমরা এসব সলভ করার চেষ্টা করছি। আমার পলিসি হলো আমি কোনো ঘুষ নেবো না, দুর্নীতি করবো না। আপনারা এসব অনিয়ম লিখলে ভালো হয়, আমরা এসব লোককে ধরতে পারবো।