ইয়েমেনে হুতি ও সরকারি বাহিনীর তীব্র লড়াই, বন্ধ সৌদির তেল পাইপলাইন

ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখার পতনের পর দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি এবং সরকারি বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী ও তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ শহরের নিকটবর্তী কাধা এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে দুই পক্ষ মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে। এর পাশাপাশি হুতিরা গুরুত্বপূর্ণ শহর মারিবের দিকে অগ্রসর হওয়ায় সেখানেও তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। এই সংঘাতের জেরে একদিকে যেমন হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন, অন্যদিকে হুতিদের ড্রোন হামলার কারণে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে গেছে।

রাজধানী সানা থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক ইউসুফ মাওরি জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার মোখা শহরের পতনের পর তাইজের মাকবানাহ জেলার কাধা এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়। সরকারি বাহিনী সেখানে বিমান হামলা চালাচ্ছে এবং উভয় পক্ষই অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করছে। এছাড়া, মারিবের পশ্চিমে আল-মাশজাহ ও আল-জোর এলাকায় হুতিদের বড় ধরনের একটি হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে সরকারি বাহিনী। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাস ক্যাম্পের কাছেও ব্যাপক গোলাগুলি ও বিমান হামলা চলছে। উল্লেখ্য, মারিবে ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বড় তেল ও গ্যাসক্ষেত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা রয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর প্রধান সরবরাহ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

সরকারপন্থী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্স জানিয়েছে, গত ৯ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূলে হুতিদের সঙ্গে লড়াইয়ে তাদের পাঁচ শতাধিক সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় দেড় হাজার। বাহিনীটির দাবি, হুতিদের পক্ষে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি। প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য ও মারিবের গভর্নর সুলতান আল-আরাদা মোখা ও পশ্চিম উপকূলে সরকারি বাহিনীর পরাজয়কে ‘দুঃখজনক’ হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, তাদের একটি অংশ সেখান থেকে সরে গিয়ে মারিবে নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। এদিকে, মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বাশা রিপোর্ট রিস্ক অ্যাডভাইজরির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আল-বাশা মনে করেন, সরকারপন্থী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বিভাজনের সুযোগ নিয়ে হুতিরা দ্রুত অগ্রসর হতে পারছে।

জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, গত জুলাই মাস থেকে ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাতের কারণে প্রায় ৭৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, চলতি সপ্তাহেই দুই হাজারের বেশি মানুষ লোহিত সাগরের পশ্চিম তীর পেরিয়ে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারি বাহিনীর সমর্থনে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত কমলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটিতে আবারও পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সংঘাতের অংশ হিসেবে হুতিরা সৌদি আরবেও হামলা জোরদার করেছে। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, তাঁরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের শারুরাহ সামরিক ঘাঁটির অস্ত্রের গুদাম ও কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছেন। এছাড়া জাজান প্রদেশের আল-তুওয়াল এলাকায় হুতিদের হামলায় কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ। হুতিদের ড্রোন হামলার কারণে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে গেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে মাত্র ৫ থেকে ৭ দিনের তেল মজুত রয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে এই পাইপলাইন চালু করা না গেলে সৌদির তেল রপ্তানি দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল কমে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ এবং এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অন্যদিকে, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি অঞ্চলেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির অদূরে কাসেম দ্বীপের কাছে তাদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন হামলায় একজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিসহ মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্য ওমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসছে ইরান, তবে বাহরাইন এই বৈঠকে অংশ নেবে না বলে জানিয়েছে। আয়ারল্যান্ডের ডুনবেগে নিজের গলফ রিসোর্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের এই বৈঠক নিয়ে তাঁর কোনো মাথাব্যথা নেই, এটি তাদের নিজস্ব বিষয়।

সশস্ত্র গোষ্ঠীটি বলছে, গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি বাহিনী ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে।

হুতিদের দাবি, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়া এলাকায় সৌদি বাহিনী ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে।