ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কেন মানছে না চীন?

গত ৩১ আগস্ট কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে চীন, রাশিয়া ও ভারতের নেতারা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার বার্ষিক সম্মেলনে মিলিত হন। সেখানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলন শেষে ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত চূড়ান্ত ঘোষণায় একটি নতুন উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতে, এই ব্যাংকটি এমন দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব সর্বনিম্ন রাখবে, যারা একতরফা সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক হাতিয়ারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার মাত্র এক সপ্তাহ পর এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও ইরান সেখানে একঘরে হওয়ার পরিবর্তে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর করা কতটা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বেইজিংয়ের ইরানের পাশে দাঁড়ানোর পেছনে মূলত নিজস্ব স্বার্থ কাজ করছে। চীন ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি কিনে দেশটির অর্থনীতি সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। এই বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তারা ‘ডার্ক ফ্লিট’ নামে পরিচিত জাহাজ ব্যবহার করছে, যা তেলের উৎস গোপন রাখে। এছাড়া ছোট ব্যক্তিমালিকানাধীন ‘টিপট’ তেল শোধনাগারগুলোও এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় তারা সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বেইজিংয়ের রয়েছে এবং অন্য কোনো দেশের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে তারা আগ্রহী নয়।

চীনের দৃষ্টিতে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে চীন ও ইরানের বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। ইরানের সঙ্গে লেনদেনকারী অনেক চীনা ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান শুধু তেহরানের সঙ্গেই ব্যবসা করে এবং রেনমিনবি বা পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে লেনদেন নিষ্পত্তি করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তের বাইরের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা তাদের ওপর খুব কমই প্রভাব ফেলে। যারা ডলারে লেনদেন করে, তাদের অনেককে কাগুজে কোম্পানির আড়ালে রাখা হয়, যার ফলে একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও দ্রুত আরেকটি তৈরি করা সম্ভব হয়। ওয়াশিংটন বড় চীনা ব্যাংকগুলোকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনে চাপ বাড়াতে চাইলেও চীন পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা রাখে। এছাড়া যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চাপে থাকায় এবং সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় চীনের সঙ্গে নতুন সংঘাতে জড়ানো ওয়াশিংটনের জন্য সুবিধাজনক নয়।

ইরানের পরাজয় চীনের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্যও ব্যয়বহুল হতে পারে। বেইজিং আশঙ্কা করে, ইরান পরাজিত হলে মধ্যপ্রাচ্য আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়ে ফিরে যাবে, যা চীনের আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে দেবে এবং পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিরক্ষায় সহযোগিতাকে কঠিন করে তুলবে। এছাড়া চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা ৪০ শতাংশ তেলের মধ্যে ইরানের ১০ শতাংশ অংশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই সরবরাহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে চীনের অর্থনৈতিক জীবনরেখা কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যাবে।

তবে চীন ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক বা রাজনৈতিক জোটও চায় না, কারণ এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে পারে। বেইজিং তেহরানের সঙ্গে হিসাব করে দূরত্ব বজায় রাখছে, যার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়, পেজেশকিয়ান এখনো বেইজিং সফরের আমন্ত্রণ পাননি এবং বিশকেকে চীনা নেতা তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেননি। পরিশেষে, দুই দেশের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও বেইজিং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ সম্পর্কে অবগত, তাই চীনের বর্তমান অবস্থানে অবাক হওয়ার কারণ নেই। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উচিত আধিপত্যবাদী মানসিকতা ত্যাগ করে আলোচনার টেবিলে ফেরা, অন্যথায় এই দুর্ভোগ গোটা বিশ্বের জন্যই দীর্ঘায়িত হবে।