নারী উদ্যোক্তার ওপর প্রকাশ্য হামলা: আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ কোথায়?

করোনা মহামারির কঠিন সময়ে যখন মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছিলেন, তখন দেশের ঘরে ঘরে নারীরা নতুন এক কর্মচাঞ্চল্যের সূচনা করেছিলেন। সাংসারিক গণ্ডি পেরিয়ে সামান্য পুঁজি ও পুরোনো দক্ষতা নিয়ে তাঁরা উপার্জনের পথে নেমেছিলেন। অনলাইনের কল্যাণে ‘নারী উদ্যোক্তা’ পরিচয়টি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে এক নতুন মর্যাদার জায়গা তৈরি করেছিল। তবে সেই উদ্যোক্তারা এখন আর কেবল মুঠোফোনের পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই, তাঁরা এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। হাটে-বাজারে পুরুষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে ব্যবসায়িক বিরোধে জড়িয়ে পড়া তাঁদের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু রাজবাড়ী কাপড়বাজারের ব্যবসায়ী জাকিয়া সুলতানাকে যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, তা চরম অমানবিক ও অসভ্যতার বহিঃপ্রকাশ।

গত ২৯ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাজবাড়ী সদর থানা-পুলিশের এক নারী সদস্য ভুক্তভোগী জাকিয়া সুলতানার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন এবং পেছনে দুজন পুরুষ পুলিশ সদস্য রয়েছেন। রাষ্ট্রীয় পাহারার এমন বলয়ের ভেতরে ঢুকে একাধিক যুবক যেভাবে ওই নারীর ওপর উন্মত্তের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে একের পর এক ‘ফ্লাইং কিক’ বা লাথি মেরেছে, তা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। একজন মানুষের প্রতি, বিশেষ করে একজন নারীর প্রতি ক্ষোভের প্রকাশ কতটা অসভ্য পর্যায়ে পৌঁছালে এমন ন্যক্কারজনক দৃশ্য দেখা যায়, তা ভাবিয়ে তোলে। পুলিশের উপস্থিতিতেই এ তাণ্ডব ঘটা ঘটনাটির সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ও দুঃখজনক দিক।

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই নির্মমতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি মূলত সমাজে জেঁকে বসা ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনির সংস্কৃতিরই ধারাবাহিকতা। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকের নিরাপত্তা ও শাস্তির একমাত্র কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু যখন সমাজ ধরে নেয় যে তাৎক্ষণিক শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে বিরোধের মীমাংসা সম্ভব এবং রাষ্ট্র তা নীরব দর্শকের মতো দেখে, তখন আইনের শাসন ভেঙে পড়ে। রাজবাড়ীর এই ঘটনায় জাকিয়া সুলতানার বিরুদ্ধে তাঁর সাবেক নারী কর্মীর বেতন না দেওয়া বা অসদাচরণের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা প্রমাণের দায়িত্ব বাজার কল্যাণ সমিতি ও আদালতের। কিন্তু ব্যবসায়িক বিরোধ যখন রাজপথে ট্রমাটিক হামলায় রূপ নেয়, তখন সেখানে পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বের আদিম রূপটি নগ্নভাবে ফুটে ওঠে।

জাকিয়া সুলতানার দাবি, তাঁর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জেলাজুড়ে প্রায় চার হাজার নারী কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটিতে এমন নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হওয়া কেবল তাঁর মনোবলের ওপর আঘাত নয়, বরং এটি স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য চরম ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করবে। পুলিশ সদস্যরা ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিচ্ছিলেন, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু বাহিনীর বলয়ের ভেতর ঢুকে দুষ্কৃতিকারীরা যেভাবে সেই নারীকে লাঞ্ছিত করল, তা রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও আইনের প্রয়োগব্যবস্থাকে সরাসরি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো। এই ঘটনায় কয়েকজন অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন, তবে অপরাধীরা যেন রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবে পার পেয়ে না যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

ই–মেইল: [email protected]মতামত লেখকের নিজস্ব