গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা ও আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ছয় মাস পার করেছে। সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরের এই যুদ্ধক্ষেত্রের প্রভাব বাংলাদেশের নগর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র আছড়ে পড়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম এক দফা বাড়লেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, বরং সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশে লোডশেডিং ফিরেছে। গ্যাস না পাওয়ায় বাসাবাড়ির রান্না থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সিএনজি পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গ্যাস মিলছে না। সার কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ–সংকটে চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রায় ৫০ শতাংশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ২০১৬ সালের পর থেকে গ্যাস খাতকে ধারাবাহিকভাবে আমদানিনির্ভর করে তোলার যে মাশুল, তা এখন বাংলাদেশকে কড়ায়-গন্ডায় গুনতে হচ্ছে। এর আগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা ও আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর এই আমদানিনির্ভরতা যে কত বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে, তা স্পষ্ট হয়েছিল। কিন্তু সেই সংকট থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনে করে মূল ভূখণ্ডে না আনার পেছনে কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠীস্বার্থ রয়েছে কি না। ২০১৮ সালে ভোলা থেকে মূল ভূখণ্ডে গ্যাস আনার জন্য পাইপলাইন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ৬০০ কোটি টাকার জন্য আওয়ামী লীগ আমলে এই প্রকল্প ফেলে রাখা হয়। পাইপলাইন করে গ্যাস আনা লাভজনক হবে না—এমন যুক্তিতে আট বছরেও সেটি করা হয়নি। অথচ এলএনজি আমদানিতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, যে পাইপলাইন তখন ৬০০ কোটি টাকায় করা সম্ভব ছিল, সেটি এখন করতে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
তৎকালীন সরকার শতভাগ বিদ্যুতায়নের উৎসব করার পরপরই সংকট শুরু হয়। রাশিয়ার গ্যাস ইউরোপ না কেনায় স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে যায়। জ্বালানি কিনতে বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার দ্রুত ফুরিয়ে আসতে থাকে। দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরও সংকট কাটেনি। সরকারি হিসাবেই মূল্যস্ফীতি ১৩ থেকে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে ভাটা পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ছয় লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সারের সংকটে চালের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের গ্যাসের মোট চাহিদার ৪০ থেকে ৪২ শতাংশ আসে দেশি উৎস থেকে। বাকিটা এলএনজি দিয়ে মেটাতে হয়, যার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বাধা তৈরি হচ্ছে এবং কাতারসহ এলএনজি সরবরাহকারী দেশগুলোর অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিকেই ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণের বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
তেল–গ্যাস–খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ২০১৭ সালে জ্বালানিসংকটের টেকসই সমাধান নিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা দিয়েছিল। অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ সম্প্রতি লিখেছেন, নিজেদের গ্যাসসম্পদ উত্তোলনে জাতীয় সক্ষমতা তৈরি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা বাস্তবায়নে জোরদার নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের সংমিশ্রণই আমাদের জন্য সর্বোত্তম পথ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া গত ২৩ আগস্ট সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন, ডিপ ড্রিলিং ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নতুন অনুসন্ধানে ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হলে ৫ লাখ কোটি টাকার গ্যাস পাওয়া সম্ভব। তিনি মনে করেন, বর্তমান ও সম্ভাব্য মজুত মিলিয়ে ১৮ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া সম্ভব।
২০১৬-১৭ সালের পর থেকে দেশে ধারাবাহিকভাবে গ্যাসের উৎপাদন কমছে। অথচ ভোলায় বিপুল পরিমাণ গ্যাস পাওয়ার পরও পাইপলাইনে করে তা জাতীয় গ্রিডে আনা হয়নি। ভোলায় আবিষ্কৃত তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় পাঁচ টিসিএফ গ্যাসের মজুত রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা। অথচ দৈনিক উৎপাদন–সক্ষমতার অর্ধেক গ্যাসও সেখান থেকে তোলা হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসেও ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনার সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকারের আমলেও পাইপলাইন খুলনা না ঢাকা পর্যন্ত হবে, সেই সিদ্ধান্ত হয়নি। জ্বালানিসংকটে যখন গোটা দেশ ভুগছে, তখন নিজেদের গ্যাস ব্যবহার করতে না পারা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

