অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের আমলে বেতন ও মজুরি সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ এসেছিল। এর একটি হলো জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫-এর সুপারিশ, যা সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল। অন্যটি সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ, যা শ্রমিকের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির কথা বলেছিল। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার বেতন কমিশন নিয়ে যতটা উৎসাহ দেখিয়েছিল, শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ তেমন গুরুত্ব পায়নি। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শ্রমজীবী মানুষের আত্মত্যাগ ছিল অপরিসীম। অভ্যুত্থানের পর পোশাকশ্রমিকদের মজুরি মাত্র ৪ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে, যা বার্ষিক ৫ শতাংশ নিয়মিত বৃদ্ধিসহ মোট ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি সেই সময়ের মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ কম, ফলে প্রকৃত আয় কমেছে।
বর্তমান সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই বেতন বৃদ্ধির আর্থিক সংস্থান। বাজেটে (২০২৬-২৭) জনপ্রশাসনের জন্য ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তি বরাদ্দ রাখা হলেও, ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ বেতন বাড়াতে বছরে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি প্রয়োজন। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায়—যেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া, ভর্তুকি এবং জ্বালানি আমদানিতে তীব্র সংকট রয়েছে—সেখানে এই বাড়তি অর্থের জোগান দেওয়া কঠিন। সরকার জানে যে বেতন না বাড়ালে প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হতে পারে, তাই তারা এক প্রকার চাপে রয়েছে।
আয় বাড়ানোর জন্য করের আওতা বাড়ানো বা কর ফাঁকি রোধের কথা বলা হলেও মানুষের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা খুবই সীমিত। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা এবং দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের বাড়তি কর দেওয়ার সামর্থ্য নিঃশেষ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে একমাত্র বিকল্প হলো ব্যয় সংকোচন। ১৯৯৩ সালে সাবেক সচিব এম নুরুন্নবী চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন কমিটি (এআরসি) গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি ১৯৯৬ সালে তাদের প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা ৩৫ থেকে কমিয়ে ২২টি করা, ৪৭টি সংস্থা বিলুপ্ত করা এবং ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিল। কমিটির ধারণা ছিল, সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে প্রায় ১৭৪ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে এবং ৪৬ হাজার ২৭৬ জন সিভিল কর্মচারী অতিরিক্ত হবে। বিএনপি সরকার তখন মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বর্তমান সরকার এখন প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সংখ্যা কমানোর চিন্তা করতে পারে।
সরকারের বিলাসিতা বাদ দেওয়াও জরুরি। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর কার্যালয়ে দুপুরের খাবার ১৫০ টাকার মধ্যে সারছেন, যা উৎসাহব্যঞ্জক। এছাড়া প্রকল্পের গাড়ি পরিবহন পুলে জমা না দিয়ে আমলাদের ব্যবহার করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। সরকারি চাকরিজীবীদের বৈঠক করার ভাতা, অহেতুক প্রশিক্ষণ, অপ্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও ভবন নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। সরকারি ব্যয় কমানোর উপায় খুঁজে বের করতে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে তার সুপারিশ বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া প্রয়োজন।
দেশে আয়বৈষম্য এখন বিপজ্জনক পর্যায়ে। সমাজের একটি অংশ যখন আড়াই হাজার টাকা কেজি দরে ইলিশ কিনে বাসায় ফেরে, তখন আরেকটি বড় অংশ কিছুটা কম দামে চাল কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে রোদে পোড়ে। করোনাকালে যখন বহু মানুষ চাকরি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছিলেন, তখন সরকারি চাকরিজীবীরা পূর্ণ বেতন ও উৎসব ভাতা নিয়ে ছুটিতে ছিলেন। এই বৈপরীত্য সমাজে ‘ওঁরা বনাম আমরা’—এই ভয়ংকর অনুভূতির জন্ম দেয়। বৈষম্যের শিকার হওয়ার বোধই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের মাঠে নামিয়েছিল। মাসে সাত থেকে আট হাজার টাকা বেতনে কাজ করা তরুণ ও হকাররা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে ছিলেন। তাদের মধ্যে থাকা এই অনুভূতি সরকারের জন্য সবচেয়ে চিন্তার বিষয়। সরকার ‘ওঁরা’র কথা শুনেছে, এখন ‘আমরা’র কথা শুনতে কান পাততে হবে।

