আদিবাসী পরিচয়ের সংকট ও উত্তরণের বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড

বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল সংকটটি রাজনৈতিক নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্য। ২০০৭ সাল থেকে বেদে ও ডোম জনগোষ্ঠীর মতো প্রান্তিক গোষ্ঠী নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতায় লেখক রঞ্জনা বিশ্বাস লক্ষ্য করেছেন যে, ‘আদিবাসী’ শব্দের সংজ্ঞা নিয়ে আমাদের সমাজে ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে। Indigenous Peoples, Ethnic Community, Tribe বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী—এই শব্দগুলোকে পরস্পরের সমার্থক মনে করার প্রবণতা এই বিতর্কের অন্যতম কারণ।

জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশন নং ১৬৯-এ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কোনো একক ও চূড়ান্ত সংজ্ঞা নেই। জাতিসংঘ মূলত ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, পূর্বপুরুষের ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ভাষা এবং বৃহত্তর সমাজে অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়। ILO-এর মতে, একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ই হলো তাদের আদিবাসী হিসেবে সনাক্ত করার মৌলিক মানদণ্ড। বাইরের কারো নির্ধারণ করা পরিচয়ের চেয়ে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর নিজস্ব আত্মপরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া আধুনিক নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গবেষণার সুবিধার্থে বিশ্বব্যাংকের OP 4.10 নীতিমালা ব্যবহার করে চারটি প্রধান বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা যেতে পারে: নিজস্ব সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, পূর্বপুরুষের ভূখণ্ডের সঙ্গে সমষ্টিগত সম্পর্ক, সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ থেকে ভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বতন্ত্র ভাষা। তবে সব বৈশিষ্ট্য সমান মাত্রায় উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক নয়। জোরপূর্বক উচ্ছেদ বা ভূমিচ্যুতির কারণে কোনো গোষ্ঠী ঐতিহাসিক ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও তাদের আদিবাসী পরিচয় মুছে যায় না। একইভাবে, ভাষা হারিয়েছে বা আদি নিবাসে নেই বলে কাউকে আদিবাসী নয় বলে ঘোষণা করা আধুনিক নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অযৌক্তিক।

বাংলাদেশে সমস্যাটি আরও জটিল কারণ আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিভাষা এবং আন্তর্জাতিক অধিকারভিত্তিক ধারণা এক নয়। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষণের কথা থাকলেও আন্তর্জাতিক পরিসরে আদিবাসী ধারণাটি ভূমি, আত্মপরিচয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া, কোনো জনগোষ্ঠীর আন্তঃঅভিবাসন বা বসতি পরিবর্তন তাদের ঐতিহাসিক পরিচয়কে বিলুপ্ত করে না। গোপালগঞ্জ থেকে রাজশাহীতে স্থানান্তরিত হওয়া নাগরিক যদি বহিরাগত না হন, তবে অন্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বর্তমান বসতি দেখে তাদের ইতিহাস অস্বীকার করা বৈজ্ঞানিক হতে পারে না।

রঞ্জনা বিশ্বাস মনে করেন, আদিবাসী বিতর্কে না জড়িয়ে আমাদের প্রয়োজন একটি ‘বৈজ্ঞানিক আদিবাসী সনাক্তকরণ কাঠামো’ তৈরি করা। এই কাঠামোতে নৃতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, ভাষাবিজ্ঞান এবং আইনের সমন্বয় থাকতে হবে। কাজেই আমার মনে হয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি বৈজ্ঞানিক Indigenous Identification Framework তৈরি করা প্রয়োজন। কোনো জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী চরিত্র ও আধুনিকতা বরং সমৃদ্ধ হয়। শেষপর্যন্ত, নিজেদের পরিচয় নির্ধারণের অধিকার সেই জনগোষ্ঠীরই থাকা উচিত।