বাগেরহাটের মোংলা এলাকার জয়মণি ঠোটা গ্রামের বাসিন্দা মিরাজ শেখকে গত ১০ এপ্রিল সাদাপোশাকে থাকা কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তি জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যান। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই ঘটনাকে চব্বিশ-পরবর্তী প্রথম গুমের ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছে। মিরাজ শেখের পরিবার এবং একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যে এই তুলে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে কোস্টগার্ডের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নানাভাবে সামনে এসেছে।
ঘটনার পরদিন ১১ এপ্রিল মিরাজ শেখের পরিবার মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ড অফিসে গেলে তাদের বলা হয়েছিল, ‘অভিযানে আছে, বিকেলে আসেন।’ তবে বিকেলে যাওয়ার পর তারা মিরাজের উপস্থিতির বিষয়টি অস্বীকার করে। এরপর ২৩ এপ্রিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও পরিবারের অভিযোগ, চারবার থানায় যাওয়ার পর পুলিশ জিডি গ্রহণ করে। এমনকি জিডিতে ঘটনার বিবরণ পরিবর্তন করতেও তাদের বাধ্য করা হয়, যেখানে কোস্টগার্ডের নাম উল্লেখ করতে দেওয়া হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল যে, জিডিতে গুম বা অপহরণের কথা লেখা যাবে না, মামলা করতে হবে; আর মামলা করলেও তা আন্তবাহিনীর বিরুদ্ধে করা যাবে না।
নিখোঁজ মিরাজ শেখের সন্ধানের দাবিতে গত ৯ জুন তাঁর পরিবার ও গ্রামবাসী মিলে একটি মানববন্ধন করেন। ওই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোস্টগার্ডের সঙ্গে এলাকাবাসীর পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই সংঘর্ষের জেরে মিরাজের পরিবারের ৩ জন নারীসহ মোট ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা টানা ২৭ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান। পরবর্তীতে দুটি সংবাদমাধ্যমে মিরাজ শেখের গুমের ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। তবে অভিযোগ ওঠে, খোদ কোস্টগার্ডের বোটে চড়েই সেই প্রতিবেদনগুলো তৈরি করা হয়েছিল এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পাল্টে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। অর্থাৎ, কোস্টগার্ড নিজেদের বক্তব্য প্রচারের জন্য সংবাদমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বারবার মিরাজ শেখের সাথে 'জলদস্যুতা'র সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সম্প্রতি এই বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে জলদস্যুতার ইস্যুটি টেনেছেন। গত ২৯ আগস্ট তিনি জানান, ঘটনাটি নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত করানো হয়েছে এবং তদন্তে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এটি বিভিন্ন জলদস্যু গ্রুপের পারস্পরিক বিরোধের ফল হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জন্ম দেয়। প্রথমত, এই তথাকথিত 'স্বাধীন তদন্ত' কমিটিতে বাহিনীর সদস্য ছাড়া বাইরের আর কারা যুক্ত ছিলেন? যদি বাইরের কেউ না থাকেন, তবে একে কীভাবে স্বাধীন তদন্ত বলা যায়? দ্বিতীয়ত, গুমের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রসঙ্গটি কেন আসবে? অরাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক নজির রয়েছে। তৃতীয়ত, মিরাজ শেখ যদি অপরাধীও হয়ে থাকেন, তবে তাকে আটকে রেখে আদালতে বা থানায় হাজির না করা দেশের প্রচলিত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। অপরাধী হলেও তাঁর মানবাধিকার এবং আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ মূলত একটি বড় প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে—গুমের অভিযোগের তদন্ত আসলে কে করবে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি নিজেদের বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে সক্ষম? অতীতে দেখা গেছে, সাদাপোশাকে তুলে নেওয়ার সময় এক বাহিনীর সদস্যরা অন্য বাহিনীর নাম ব্যবহার করে পরিচয় গোপন করেছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে একাধিক বাহিনীর যৌথ সম্পৃক্ততাও থাকে। ফলে এখানে স্বার্থের সংঘাত অবধারিতভাবেই চলে আসে।
এই বাস্তবতায় বর্তমানে সংসদে উত্থাপিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ বিলটি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ২০২৫ সালের গুমবিরোধী অধ্যাদেশে গুমের অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকারের প্রস্তাবিত আইনে সেই ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনের হাত থেকে তদন্তের ভার কেড়ে নিয়ে তা অন্য বাহিনী বা আন্তবাহিনীর কাছে দেওয়া হয়েছে, এমনকি আটকস্থল পরিদর্শনের ক্ষমতাও কমিশনের কাছ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে গুমবিরোধী আইনের সঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের যে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা ছিল, তা কার্যত ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ এবং বিশেষজ্ঞরা তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন যে, গুম হওয়া ব্যক্তিকে খোঁজা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত করা এক বিষয় নয়। গুমের খবর পাওয়ামাত্র কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলার অপেক্ষা না করেই অনুসন্ধান শুরু করা উচিত। বর্তমান সংসদে এমন অনেক সদস্য ও মন্ত্রী রয়েছেন, যাঁরা বিগত শাসনামলে নিজেরাই গুমের শিকার হয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও প্রস্তাবিত বিলে সেই সংবেদনশীলতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। মিরাজ শেখের ঘটনাই প্রমাণ করে যে, বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত কে করবে—এই মৌলিক প্রশ্নের সুরাহা না হলে গুমের মতো অপরাধ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মোকাবিলা করা অসম্ভব।

