আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলো নিজেদের সমালোচনা পত্রিকায় ছাপাতে বা প্রকাশ করতে বরাবরই অনীহা প্রকাশ করে। সাংবাদিকেরা প্রতিদিন অন্যের অধিকার, অন্যায় ও দুর্নীতির খবর তুলে আনেন, অথচ নিজেদের বেতন-ভাতা, চাকরির নিরাপত্তা আর পেশাগত সম্মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে তা ছাপানোর মতো কেউ থাকে না। সুস্থ সাংবাদিকতা চর্চার জন্য এই নীরবতা ভাঙা এখন বড্ড জরুরি হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে এই পেশার ভেতরে চলতে থাকা বৈষম্য আর মানসিক চাপ নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা ছাড়া উপায় নেই।
আর্থিক ও চাকরির টানাপোড়েনের বিষয়টি তুলে ধরে বছরখানেক আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার। যৌবনের শুরুতে যে মানুষটি সাংবাদিকতাকে পেশা ও নেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, তিনি মধ্যাহ্ন বয়সে এসে উপলব্ধি করেন, সাংবাদিকতায় তিনি আর জায়গা পাচ্ছেন না। পাঁচ দশক সাংবাদিকতা করার পর শেষ বয়সে এসে নতুন পেশায় নিজেকে প্রস্তুত করার মতো পরিস্থিতিও তাঁর ছিল না। যে কারণে তিনি আমাদের সমাজের সাংবাদিকতার দগদগে ঘাগুলোকে সামনে এনে তাঁর খোলাচিঠিতে লিখে গিয়েছিলেন, ‘আমি লিখেছি সত্যের পক্ষে, মানুষের পক্ষে, দেশের পক্ষে; কিন্তু আজ যখন নিজের জীবনকে দেখি, অনুভব করি সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়।’
ঠিক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আরেক সাংবাদিক আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি শুক্রবার পত্রিকার কার্যালয়ে বেশ কয়েকটি চিরকুট রেখে গেছেন, যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সাংবাদিকতার আড়ালে যুগের পর যুগ ধরে চলতে থাকা এক বাস্তবতাকে। দেড় যুগ ধরে যে পত্রিকায় তিনি কাজ করেছেন এবং নিজের যৌবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টা দিয়েছেন, সেই পত্রিকা থেকে প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে তিনি চাকরিচ্যুত হন। চাকরি না থাকলেও নিজ হাতে গড়া পত্রিকাটির বরিশাল কার্যালয়ের মায়া সম্ভবত তিনি ছাড়তে পারেননি। সমকালের এই সাংবাদিক তাই নিয়মিতই অফিসটিতে যেতেন, পত্রিকা পড়তেন। কাজ না থাকলেও নিয়মিত অফিসে যাওয়ার যে অভ্যাস ১৮ বছর ধরে গড়েছিলেন, তা হয়তো তিনি এড়াতে পারেননি।
তাঁর রেখে যাওয়া চিরকুটে অসুস্থতার কথা যেমন ছিল, তেমনি ছিল সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আর ক্ষমা প্রার্থনার সুর, এবং পত্রিকা থেকে তাঁর বকেয়া পাওনা পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়ার অনুরোধও। তাঁর স্ত্রী গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন, চাকরি হারানোর পর থেকে তিনি হতাশায় ভুগছিলেন, যদিও পরিবারের কেউ কল্পনাও করেননি বিষয়টি এত দূর গড়াবে। ঠিক কী কারণে এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের চাকরি গিয়েছিল তা স্পষ্ট নয়, তবে পরবর্তী সময়ে সমকালের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, তাঁর পাওনার হিসাব চূড়ান্ত করা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে দীর্ঘ জটিলতা চলছিল।
সাংবাদিকদের পেশাগত মানোন্নয়নের বিষয়টি সব সরকার যেমন এড়িয়ে গেছে, তেমনি মালিকপক্ষও। ফলে কম বেতনে বেশি পরিশ্রমের এই পেশাটির ভেতর জমে থাকা ক্ষোভের শিকার হচ্ছেন পুলক চ্যাটার্জিরা। চাকরি শেষে বেতন না পাওয়া কিংবা গ্র্যাচুইটি না দেওয়া কিংবা দীর্ঘসূত্রতা পেশাদার সাংবাদিকদের ভোগাচ্ছে। বাংলাদেশের সংবাদপত্রশিল্পে ওয়েজ বোর্ড থাকলেও তার বাস্তবায়ন অধিকাংশ গণমাধ্যমের নেই। ফলে দীর্ঘদিন কাজ করার পরও চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে যথাযথ ক্ষতিপূরণ বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা অনেক প্রতিষ্ঠানে থাকছে না। যত্রতত্র সাংবাদিকদের জন্য সংগঠন গড়ে উঠলেও, তারাও সাংবাদিকদের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে বাতির নিচে অন্ধকার নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে চলছে সাংবাদিকতা।
রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে ও মালিকপক্ষের তাঁবেদারিমূলক সাংবাদিকতা করতে গিয়ে এই পেশাটি তার মহত্ত্বই হারাতে বসেছে। বেতন-ভাতার আদর্শিক কাঠামোর বাস্তব রূপ না মেলায় সাংবাদিকদেরও অনৈতিক পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আবার কখনো কখনো হাউসগুলোর নীতিনির্ধারকদের পছন্দ-অপছন্দের শিকার হচ্ছেন আমাদের স্থানীয় সাংবাদিকেরা। চাকরিচ্যুতির মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। ফলে এই পেশার অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় অনেক ভালো ও পেশাদার সাংবাদিক এই পেশাটিকে বিদায় জানাচ্ছেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ থেকে পাস করে, তুলনামূলক কম ফলাফলকারীদের অন্যান্য পেশায় যখন আর্থিক স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা থাকে, তখন এই পেশায় থেকে মাস শেষে বেতন পাবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকছে।
পত্রপত্রিকা, অনলাইন ও টিভি মিলিয়ে যত সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশে আছে, এতগুলোর প্রয়োজন আছে কি না, সেই প্রশ্ন আমি আগেও তুলেছিলাম। মানসম্মত ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ফিরলে পাঠকদের প্রতিদিন ১০-১২টি গণমাধ্যমের খবর পড়ার প্রয়োজন হতো না। বিশ্বের অনেক দেশেই ৪-৫টি পত্রিকা থাকলেই সেই দেশের তথ্যের খোরাক মিটে যায়। কিন্তু আমাদের দেশে তা হচ্ছে না, ফলে অপতথ্য ও অপসাংবাদিকতা ঘিরে ধরছে পেশাদার সাংবাদিকতাকে।
পুলক চ্যাটার্জির মতো মানুষেরা সারা জীবন অন্যের কথা লিখে গেছেন। তাঁদের নিজেদের গল্প যেন হারিয়ে না যায়, সেই দায়িত্ব এখন আমাদের সবার। পুলক চ্যাটার্জিদের বাঁচাতে হলে সবার আগে সংবাদমাধ্যমের জন্য বাস্তবসম্মত একটি বেতনকাঠামোর প্রয়োজন, যা বাস্তবায়নে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি করতে হবে। আর্থিক টানাপোড়েনে আমরা আর কোনো সাংবাদিকের এমন মৃত্যু দেখতে চাই না। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র পুলক চ্যাটার্জিদের কাছ থেকে কেবল একপক্ষীয়ভাবে নিয়েই যাচ্ছে; কিন্তু প্রতিদানে দিচ্ছে না কিছু।
তাঁর স্ত্রী গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন, চাকরি হারানোর পর থেকে তিনি হতাশায় ভুগছিলেন, যদিও পরিবারের কেউ কল্পনাও করেননি বিষয়টি এত দূর গড়াবে (প্রথম আলো, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।.সাংবাদিকদের পেশাগত মানোন্নয়নের বিষয়টি সব সরকার যেমন এড়িয়ে গেছে, তেমনি মালিকপক্ষও।

