এআই দিয়ে আশির দশকের ছবি তৈরির ট্রেন্ডে কীভাবে পানির অপচয় হচ্ছে?

সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের মধ্যে আশির দশকের রেট্রো লুকের এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ছবি তৈরির হিড়িক পড়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটক স্ক্রল করলেই চোখে পড়ছে আশির দশকের ফ্যাশন ও নস্টালজিয়ায় ভরা নান্দনিক সব ছবি। তবে এ ধরনের ট্রেন্ডে গা ভাসিয়ে একটি সাধারণ এআই ছবি তৈরি করতে গিয়ে যে বিপুল পরিমাণ সুপেয় পানি অপচয় হচ্ছে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় মানুষ তার পুরোনো স্মৃতিতে ফিরে যাচ্ছে। আশির দশকের এই ট্রেন্ডে উঠে আসছে সে সময়ের ফ্যাশন, সানগ্লাস, ডেনিম জিনস, বড় বকলেসের বেল্ট, জ্যাকেট, স্টাইলিশ ব্লাউজ, বড় কানের দুল, লম্বা বা কোঁকড়ানো চুল আর আকর্ষণীয় হেয়ারস্টাইল। পশ্চিমে আশির দশক নিয়ে যে আবেগ, তা সেখানকার ইনফ্লুয়েন্সারদের হাত ধরে টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম হয়ে এখন ফেসবুকে ঝড় তুলেছে। বাংলাদেশে অবশ্য নব্বইয়ের দশকের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই ফ্যাশনের প্রভাব পড়তে শুরু করায় এ দেশের মানুষের মধ্যে নব্বই দশক নিয়ে বেশি স্মৃতিকাতরতা দেখা যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হতাশা কাটিয়ে পশ্চিমে ‘ভাইব্রেন্ট সিক্সটিজ’ মানুষকে রোমান্টিসিজমে ভাসিয়েছিল। সত্তরের দশকে ঔপনিবেশিক ক্ষমতার পতন ও সোভিয়েত যুগের পতনের মুখে স্নায়ুযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মার্কিন পুঁজিবাদ যখন উত্তুঙ্গে, তখন আশির দশকে মানুষের লাইফস্টাইলে বড় পরিবর্তন আসে। এমটিভির হাত ধরে সংগীত শুধু আর শোনার নয়, দেখার অনুভূতিতে পরিণত হয়; যেখানে মাইকেল জ্যাকসন, ম্যাডোনা ও কুইনের পারফরম্যান্স জাদুকরি চমক দেখায়। হলিউডে স্টার ওয়ার্সের যাত্রা, স্টিভেন স্পিলবার্গের পপ কালচার ক্ল্যাসিক এবং মেটাল, রক ও পপ কালচারের সঙ্গে প্রিন্সেস ডায়ানার ক্রেজ আশির দশককে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের অনন্য প্রতীক করে তোলে।

অনেকের ধারণা, কিম কার্দাশিয়ানের মতো প্রভাবশালী ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো এই ট্রেন্ড শুরু করিয়েছে। করোনা মহামারি, ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের কারণে তৈরি হওয়া মূল্যস্ফীতি কাটাতে ভোক্তাদের আকৃষ্ট করার পেছনে এমন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া, আশির দশকের ছবির অসম্পূর্ণতা, দানাদানা ভাব বা হলদেটে রঙের যে নান্দনিকতা, তা আজকের নিখুঁত ডিজিটাল দুনিয়ায় নতুন আকর্ষণ তৈরি করেছে। এখন একটি ছবি আর একটি প্রম্পট দিয়েই অনায়াসে তৈরি হচ্ছে আশির দশকের ছবি।

তবে এই ছবি তৈরির প্রতিযোগিতার পেছনে রয়েছে এক বড় পরিবেশগত বিপর্যয়। এআই সার্ভার ও ডেটা সেন্টারগুলো ঠান্ডা রাখতে যে বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়, তা সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। জাতিসংঘের পানি, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক বিশেষ পরিবেশগত গবেষণা প্রতিবেদনে এ বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এআইয়ের চাহিদা মেটাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি উত্তোলন করতে হবে, যা ডেনমার্কের বার্ষিক পানি ব্যবহারের ৪ থেকে ৬ গুণ অথবা সমগ্র যুক্তরাজ্যের অর্ধেক বার্ষিক পানি ব্যবহারের সমান।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই-সম্পর্কিত ডেটা সেন্টারগুলোর বার্ষিক পানির ব্যবহার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন (৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি) লিটারে। এই পরিমাণ পানি দিয়ে আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চলের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের পুরো এক বছরের ন্যূনতম পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। শুধু পানিই নয়, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের বড় একটি অংশ এআই ডেটা সেন্টারগুলোর পেছনে ব্যয় হতে পারে, যার পরিমাণ হতে পারে বার্ষিক ৯৪৫ টেট্রাওয়াট-ঘণ্টা।

গুগল, মাইক্রোসফট বা ফেসবুকের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের ডেটা সেন্টারের বাস্তবতাও একই রকম। ২০২৩ সালে কেবল একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ডেটা সেন্টারগুলোতেই প্রসেসর ঠান্ডা রাখার জন্য সরাসরি ২ হাজার ৯০০ কোটি (২৯ বিলিয়ন) লিটার সুপেয় পানি তুলে নেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ২ হাজার ৩০০ কোটি লিটারের বেশি পানি বাষ্পীভূত হয়ে নষ্ট হয়েছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পানের যোগ্য পানি। ওপেনএআইয়ের তৈরি করা জিপিটি-৩ এআই ভাষা মডেল একবার প্রশিক্ষণ দিতেই প্রায় ৫৪ লাখ লিটার পানির প্রয়োজন হয়েছিল। বর্তমানে একটি জনপ্রিয় এআই কোম্পানি দিনে ২৫০ কোটি প্রম্পট গ্রহণ করে কাজ করছে।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইডের গবেষকদের ‘মেকিং এআই লেস থার্স্টি’ (এআইয়ের পানির তৃষ্ণা কমানো) সংক্রান্ত গবেষণা থেকে জানা যায়, এআই দিয়ে একটি সাধারণ ছবি তৈরি বা ১০০ থেকে ৫০০ শব্দের প্রম্পট আদান-প্রদান করতে সার্ভার কুলিংয়ের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আধা লিটার (প্রায় দুই গ্লাস) থেকে ১ লিটার পানি খরচ হয়। অন্যদিকে, উচ্চমানের একটি ১০ সেকেন্ডের এআই ভিডিও তৈরিতে সার্ভার ঠান্ডা রাখতে বা শক্তি উৎপাদনে গড়ে ২০ গ্লাসের মতো সুপেয় পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। ফলে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই ট্রেন্ডে গা ভাসিয়ে একটি ছবি বানানোর অর্থই হলো দুই গ্লাস সুপেয় পানি অদৃশ্যভাবে অপচয় করা, যা পরিবেশবাদীদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি সাধারণ একটি নিবন্ধ লিখতে গিয়েও যখন এআইয়ের সাহায্য নেওয়া হয়, তখনও অজান্তেই কয়েক গ্লাস সুপেয় পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়।

কারণ, এআই সার্ভার ও ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে যে বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়, তা আমাদের ভাবনার বাইরে।এ নিয়ে ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি বা জাতিসংঘের পানি, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি বিশেষ পরিবেশগত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।.২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এআইয়ের চাহিদা মেটাতে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে ৪ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি উত্তোলন করতে হবে, যা ৪-৬টি ডেনমার্ক বা সমগ্র যুক্তরাজ্যের অর্ধেক বার্ষিক পানি ব্যবহারের সমান।

২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এআইয়ের চাহিদা মেটাতে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে ৪ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি উত্তোলন করতে হবে, যা ৪-৬টি ডেনমার্ক বা সমগ্র যুক্তরাজ্যের অর্ধেক বার্ষিক পানি ব্যবহারের সমান।