জুলফিকার আলী ভুট্টোর ভাগ্য কি বরণ করতে যাচ্ছেন ইমরান খান?

পাকিস্তানের রাজনীতিতে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এবং পরবর্তীতে সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের রোষানলে পড়ে ক্ষমতা ও জীবন হারানোর ইতিহাস নতুন নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সেই করুণ পরিণতির ছায়া এখন অনেকেই দেখতে পাচ্ছেন বর্তমান কারাবন্দী নেতা ইমরান খানের ভাগ্যে। দেশটির সামরিক আমলাতন্ত্রের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক এবং ওয়াশিংটনের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের বলি হয়ে কীভাবে এই দুই নেতার পথ একই বিন্দুতে মিলছে, তা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন ইতিহাস গবেষক আলতাফ পারভেজ।

ইমরান খান বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলে বন্দী রয়েছেন, যা ১৯৮৬ সালে ভুট্টোর ফাঁসি হওয়া পুরোনো জেলা কারাগার থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে নির্মিত হয়েছিল। গত আগস্টে আদিয়ালা জেলে ইমরানের বন্দিত্বের তিন বছর পূর্ণ হলো। এক সময়ের জনপ্রিয় এই 'ক্যাপ্টেন' এখন গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। গুঞ্জন রয়েছে, তিনি ইতিমধ্যে অন্তত একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছেন। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধা দেওয়া হচ্ছে না এবং তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে তথ্য প্রচারের ওপরও রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। তাঁর সুচিকিৎসার দাবিতে খ্যাতিমান ক্রিকেটাররা নজিরবিহীন যৌথ বিবৃতি দিলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। ইমরানের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার কয়েকটিতে সাজা হলেও উচ্চ আদালতে তা স্থগিত হচ্ছে, কিন্তু তাঁর মুক্তি মিলছে না। এমনকি তাঁর স্ত্রীকেও এই প্রতিহিংসামূলক মামলা ও বন্দিত্ব থেকে রেহাই দেওয়া হয়নি।

এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের ইতিহাসের এক নির্মম পুনরাবৃত্তি। জুলফিকার আলী ভুট্টোও একসময় সামরিক আমলাতন্ত্রের অত্যন্ত প্রিয় পাত্র ছিলেন। কিন্তু পারমাণবিক বোমা কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোর পর তাঁর পতন ত্বরান্বিত হয়। ১৯৭৭ সালের জুলাইয়ে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেও ভুট্টো জেনারেল জিয়া-উল-হকের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন; তিনি বুঝতেই পারেননি তাঁর জন্য কী অপেক্ষা করছে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৭৮ সালের মার্চে তাঁর ফাঁসির রায় হয়। ১৯৭৯ সালের ২৪ মার্চ উচ্চ আদালত সেই রায় চূড়ান্ত করার পর এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাওয়ালপিন্ডি কারাগারে তা কার্যকর করা হয়। ফাঁসির আগে কারাগারে ভুট্টোকে তিলে তিলে মারার চেষ্টা করা হয়েছিল—আলো-বাতাসহীন কক্ষে রাখা, খাবারে কাচের গুঁড়া মিশিয়ে মুখে ক্ষত তৈরি করা এবং চিকিৎসাবঞ্চিত রাখার কারণে তিনি ফাঁসির আগেই প্রায় আধমরা হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টায় ১৯৮৮ সালে জেনারেল জিয়া সেই কারাগারটি ভেঙে সেখানে 'জিন্নাহ পার্ক' নির্মাণ করেন।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে অতি জনপ্রিয় নেতাদের ওপর সামরিক বাহিনীর একাধিপত্য ধরে রাখতে সবসময়ই একটি আন্তর্জাতিক শক্তির মদদ প্রয়োজন হয়। ভুট্টোর সময় জেনারেল জিয়া যেভাবে সেই সহায়তা পেয়েছিলেন, ইমরানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে কিসিঞ্জার তাঁর স্মৃতিকথা 'হোয়াইট হাউস ইয়ার্স'-এ ভুট্টোকে মার্জিত, বুদ্ধিমান ও বিশ্বমানের ধারণাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে প্রশংসা করলেও, ১৯৭৬ সালের আগস্টে লাহোর গভর্নর হাউসের বৈঠকে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ না করলে ভুট্টোকে 'ভয়ংকর উদাহরণ' বানানোর হুমকি দেন। এরপরই ভুট্টোবিরোধী দলগুলো একজোট হয় এবং আন্দোলনকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া হয়। জিয়া-উল-হক ক্ষমতা দখল করলে যুক্তরাষ্ট্র একে পাকিস্তানের 'অভ্যন্তরীণ বিষয়' বলে এড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে ইরানে শাহের পতন এবং আফগানিস্তানে soviet আগ্রাসনের কারণে ওয়াশিংটনের কাছে জিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম হয়ে ওঠে, যার ফলে তিনি ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও ১১ বছর ক্ষমতায় টিকে যান।

ইমরানের ক্ষেত্রেও ট্র্যাজেডির শুরু হয়েছিল অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকে। ক্ষমতায় আসার আগে আফগান তালেবানের প্রতি তাঁর সহানুভূতিশীল অবস্থান সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের অনুকূলে থাকলেও, ২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর তাঁর উল্লাস এবং একই বছরের শেষের দিকে আইএসআই প্রধান নিয়োগে নিজের পছন্দ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা সামরিক আমলাতন্ত্রকে ক্ষুব্ধ করে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর দিনেই দীর্ঘ ২৩ বছর পর কোনো পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরানের মস্কো সফর ওয়াশিংটনকে চরম অসন্তুষ্ট করে। এই সুযোগ লুফে নেয় দেশটির সামরিক বাহিনী।

ভুট্টোর আমলের মতোই ইমরানের বিরুদ্ধেও ২০২২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে বিরোধীরা জোট বাঁধে। ইমরান এই পতনের পেছনে মার্কিন ইন্ধনের অভিযোগ তোলেন এবং তাঁর দল পিটিআই সরাসরি জেনারেলদের নাম ধরে সমালোচনা শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে ঐতিহাসিক রেষারেষি ভুলে শরিফ ও ভুট্টো পরিবার হাত মেলায়। সামরিক আমলাতন্ত্র, ভুট্টো ও শরিফ বংশের এই শক্তিশালী ত্রিভুজ ওয়াশিংটনের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ ২০২৪ সালের নির্বাচনে পিটিআই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তাদের ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয়নি এবং দলটিকে প্রায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে জেনারেল জিয়ার অনেক মিল খুঁজে পান বিশ্লেষকেরা। দুজনেই রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এবং মার্কিনপন্থী। জিয়ার সঙ্গে যেমন রোনাল্ড রিগ্যানের ঘনিষ্ঠতা ছিল, তেমনি আসিম মুনিরের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুসম্পর্ক দৃশ্যমান। এমনকি গাজার গণহত্যা ও ইরানের ওপর অবরোধের মধ্যেই গত বছরের জুনে মুনির ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। বর্তমানে পিটিআইয়ের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা কারাগারে বা নিষ্ক্রিয় থাকলেও, ইমরানকে মুক্ত করতে দলটি আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর Islamabad অভিমুখে লংমার্চের ডাক দিয়েছে। যদিও দলের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ায় এবং নতুন নেতাদের মধ্যে আস্থাহীনতার কারণে এই কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইমরানের প্রতি সামাজিক সহানুভূতি দিন দিন বাড়ছে, যা আসলে পাকিস্তানের নাগরিকদের দীর্ঘদিনের 'হাকিকি আজাদি' বা প্রকৃত স্বাধীনতার আকুতিরই বহিঃপ্রকাশ।

বেদনাবিধুরও বটে।পারমাণবিক বোমার প্রযুক্তি আয়ত্ত করা নিয়ে ১৯৭৬-৭৭ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের অপছন্দনীয় হয়ে উঠলেও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে তরুণ ভুট্টোকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কার্টারের পর রিগ্যান এলে সেটা আরও ঘনিষ্ঠতা পায়।.ট্র্যাজেডি ২.০ক্ষমতায় আসার আগে আফগান তালেবানের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন ইমরান।