ঋণের নামে দেশের ২৬টি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়ে বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে। এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে পাচার করে যুক্তরাজ্য, হংকং, জার্সি দ্বীপ ও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের আইল অব ম্যানসহ বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার স্ত্রীর প্রকৃত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে জার্সির ইউবিএস ব্যাংকে থাকা ৫৩ লাখ পাউন্ড (৫ দশমিক ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড) জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবির এই আদেশ প্রদান করেন। আদালতের নির্দেশে জার্সির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যাংক হিসাব এবং ওই প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ বা জব্দ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
দুদকের আদালতে দেওয়া আবেদনে উল্লেখ করা হয়, নজরুল ইসলাম মজুমদার, তার পরিবারের সদস্য এবং সহযোগীরা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। এই অর্থের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। পাচারকৃত অর্থ দিয়ে বিদেশে বিভিন্ন কোম্পানি গঠন, বিপুল সম্পদ ক্রয় এবং ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। অর্থ পাচারের এই জটিল ও চতুর কৌশলের কারণে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নজরুল ইসলাম মজুমদারকে ‘ম্যাজিক মাস্টার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, আইল অব ম্যানের ঠিকানায় নিবন্ধিত ‘ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড’ নামের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ২০১৯ সালের ১৭ মে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ওই বছরের ২ অক্টোবর জার্সির ইউবিএস ব্যাংকে এই প্রতিষ্ঠানের নামে একটি হিসাব খোলা হয়। চলতি বছরের ৬ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, ওই অ্যাকাউন্টে ৫৩ লাখ পাউন্ড জমা ছিল। অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের প্রকৃত মালিক হলেন নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার স্ত্রী নাসরিন ইসলাম। ওই অর্থ অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া বা সম্পদ হস্তান্তর ঠেকাতে দুদক আদালতে তা জব্দের আবেদন জানিয়েছিল।
নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের জাল বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দুদক জানতে পেরেছে, একই কায়দায় একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে—কখনো গ্রুপের মূল প্রতিষ্ঠানের নামে, কখনো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে। আবার কোথাও বিশেষ সুবিধায় ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল করানো হয়েছে। এক ব্যাংকের টাকা দিয়ে অন্য ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের চক্রাকার খেলাও চলেছে বছরের পর বছর। এর আগে একটি ব্যাংক থেকেই নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ৯৯৮ কোটি টাকাই দেওয়া হয়েছিল বিশেষ বিবেচনায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনেও এসব ঋণে নানা অনিয়ম ধরা পড়ে। তৈরি পোশাক ও সুতা ব্যবসার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে মূলত এই ঋণের বড় অংশ নেওয়া হয়।
দুদক কর্মকর্তারা নজরুলের বিদেশে অর্থ পাচারের বিভিন্ন পথ খতিয়ে দেখছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অর্থ সরানো হয়েছে। পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেখিয়ে (ওভার-ইনভয়েসিং) বিদেশে অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো, রপ্তানি করা পণ্যের মূল্য দেশে না এনে বিদেশে রেখে দেওয়া এবং কম মূল্য দেখিয়ে বাকি অর্থ অন্য উপায়ে পাচার করার মতো কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্য, হংকং, আইল অব ম্যান ও জার্সিতে নজরুলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক কোম্পানির সন্ধান মিলেছে, যার মাধ্যমে তিনি বিদেশে ব্যবসা ও সম্পদ ক্রয় করেছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন নজরুল ইসলাম মজুমদার। বছরের পর বছর ধরে তিনি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যানের পদটি আঁকড়ে ধরে রাখেন। এই শীর্ষ পদে বসে ব্যাংক খাতে তিনি একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন। সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগের সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি ও তহবিলের নামে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে সেই সময়ের একটি ‘মূর্তিমান আতঙ্ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অনেকে আড়ালে তাকে ‘ব্যাংক চাঁদাবাজ’ বলেও ডাকতেন।

