কাগজে-কলমে লাভ দেখালেও হাজার হাজার কোটি টাকার দেনায় জর্জরিত বিমান

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কাগজে-কলমে শত শত কোটি টাকার মুনাফা দেখালেও বাস্তবে বড় ধরনের ঋণ ও বকেয়ার জালে আটকা পড়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েলের বিপুল পরিমাণ বকেয়া পরিশোধ না করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন কিংবা বিমানের প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল হলেও এই বকেয়া আদায়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হচ্ছে না, যা দেশের বিমান চলাচল খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর আর্থিক চাপ বাড়িয়ে তুলছে।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত বিমানের বিভিন্ন অ্যারোনেটিক্যাল ও নন-অ্যারোনেটিক্যাল চার্জের মূল বকেয়া এবং সারচার্জ বা জরিমানা মিলিয়ে মোট দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৮৭৪ টাকা। দেশের ৫টি দেশীয় এয়ারলাইন্সের কাছে বেবিচকের মোট পাওনা ৭ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি, যার মধ্যে বিমানের একার কাছেই আটকে আছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অর্থ দেশের এভিয়েশন খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগের সমান। বিমানের বকেয়া এই অর্থ দিয়ে ৩ হাজার ৭১০ কোটি টাকার কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং ২ হাজার ১৬ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প—উভয় কাজই শতভাগ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো। এছাড়া এই অর্থ সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ ব্যয়ের তিন গুণ এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের প্রায় ২৭ শতাংশ ব্যয়ের সমতুল্য।

বিমানের এই বকেয়া দেশের আটটি বিমানবন্দরে বিভক্ত রয়েছে। এর মধ্যে দেশের প্রধান তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বকেয়ার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানের বকেয়া ৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা এবং সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৬০৩ কোটি টাকা। এছাড়া যশোর বিমানবন্দরে ১০ কোটি টাকা, কক্সবাজার বিমানবন্দরে ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা, রাজশাহী বিমানবন্দরে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা, সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ৩৬ লাখ টাকা এবং বরিশাল বিমানবন্দরে ৩১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। এই বকেয়া অর্থের মধ্যে সরকারের রাজস্ব খাতের ৫১২ কোটি টাকার ভ্যাট এবং ৫৩ লাখ টাকার আয়করও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা দীর্ঘদিন পরিশোধ না করায় জাতীয় রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অন্যদিকে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা আয় এবং ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও সংস্থাটি ২৮২ কোটি টাকা লাভ দেখায়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, লাভ দেখানোর পরও কেন তারা বকেয়া পরিশোধ করছে না। বেবিচকের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েলের কাছেও বিমানের বকেয়া রয়েছে ১ হাজার ২৭৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। বিমান বর্তমানে নতুন করে তেল কেনার টাকা নিয়মিত পরিশোধ করলেও আগের পুরনো বকেয়া পরিশোধ করছে না। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে শুরু হওয়া পদ্মা অয়েলের এই বকেয়া ২০২০ সালের করোনা মহামারির আগে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকায় ঠেকেছিল। সে সময় প্রতি মাসে ৩০০ কোটি টাকার জেট ফুয়েল কিনে বিমান মাত্র ২০ কোটি টাকা পরিশোধ করতো।

করোনাকালে লোকসানের অজুহাতে বিমান বকেয়া মওকুফের আবেদন করলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ও অর্থ মন্ত্রণালয় তা খারিজ করে দেয়। এর আগে ২০০৮ সালে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার দেনার মুখে পড়লে অর্থ মন্ত্রণালয় বিমানের ১ হাজার ২১৬ কোটি টাকার সারচার্জ মওকুফ করেছিল। ২০১৭ সালেও বেবিচক তাদের ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বকেয়া মাফ করে দেয়। তবে বেবিচক ও পদ্মা অয়েল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, এবার আর কোনো বকেয়া মওকুফ করা হবে না। বর্তমানে বিমান অত্যন্ত ছোট কিস্তিতে এই বকেয়া পরিশোধের চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই ধীরগতির কিস্তি প্রক্রিয়া চলতে থাকলে বিমানের সম্পূর্ণ বকেয়া পরিশোধ করতে আরও প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর সময় লেগে যাবে। বেবিচকের মুখপাত্র মুহাম্মদ কাউছার মাহমুদ জানান, বকেয়া আদায়ের জন্য বিমানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। তারা আশা করছেন, এই পাওনা দ্রুত আদায় করা সম্ভব হবে।

পরবর্তীতে করোনাকালীন লোকসানের অজুহাতে বকেয়া মওকুফের আবেদন করলেও বিপিসি ও অর্থ মন্ত্রণালয় তা খারিজ করে দেয়। এর আগেও ২০০৮ সালে প্রায় ১৮০০ কোটি টাকার দেনায় পড়লে অর্থ মন্ত্রণালয় বিমানের ১২১৬ কোটি টাকার সারচার্জ মওকুফ করেছিল। ২০১৭ সালেও বেবিচক তাদের ১৭০০ কোটি টাকার বকেয়া মাফ করে দেয়। বেবিচক ও পদ্মা অয়েল জানিয়েছে, আর কোনো টাকা মওকুফ পাচ্ছে না বিমান।