আয়শা ওয়াহাবের জয় এবং আমেরিকার প্রগতিশীল রাজনীতির নতুন বার্তা

বিশ্বজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রায়শই নেতিবাচক আলোচনা শোনা যায়। ভিয়েতনাম, ইরাক কিংবা আফগানিস্তানের যুদ্ধ থেকে শুরু করে চলমান ইরান সংকট—কোনোটিই দেশটির বৈশ্বিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেনি। বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনে মার্কিন সমর্থন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত শুল্কনীতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। তবে এই নেতিবাচক খবরের আড়ালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ইতিবাচক রূপ রয়েছে, যা প্রায়ই আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। এটি এমন এক আমেরিকা, যা মানুষের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ করে দেয়। কে কোথা থেকে এসেছেন বা কার পারিবারিক পরিচয় কী, তা এখানে মুখ্য নয়; বরং মেধা ও পরিশ্রমের জোরে যে কেউ নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের এই অবারিত সুযোগের অন্যতম বড় উদাহরণ ড. আয়শা ওয়াহাব। সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪ নম্বর কংগ্রেসনাল এলাকার বিশেষ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আফগান শরণার্থী দম্পতির সন্তান আয়শার এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। ১৯৮৭ সালে নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া আয়শা খুব ছোটবেলাতেই পিতৃহীন হন, যখন তাঁর বাবা আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। এর কিছুদিন পর তাঁর মা-ও মারা যান। এরপর আয়শা ও তাঁর বোনকে সরকারি তত্ত্বাবধানে (ফস্টার কেয়ার) রাখা হয়। পরবর্তীতে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আফগান পরিবার তাঁদের দত্তক নেয়। প্রতিকূলতা জয় করে আয়শা ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সমাজকর্মে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি প্রযুক্তি খাত, অলাভজনক সংস্থা ও সামাজিক প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন। ২০১৮ সালে হেওয়ার্ড সিটি কাউন্সিলের সদস্য এবং ২০২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট সিনেটর নির্বাচিত হওয়া আয়শা এবার পা রাখলেন মার্কিন কংগ্রেসে।

আয়শা ওয়াহাবের এই বিজয়কে আমেরিকার প্রগতিশীল রাজনীতির এক বিরাট জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার এই বিশেষ নির্বাচনে তাঁকে পরাজিত করতে ইসরায়েলপন্থী লবি ‘আইপাক’ (AIPAC) প্রায় চার মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল। ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হার্নান্দেজকে সমর্থন দিয়েছিল তারা। কিন্তু সান ফ্রান্সিসকোর ভোটাররা বিপুল ভোটে আয়শাকেই তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন। নির্বাচনী প্রচারণায় গাজা পরিস্থিতিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করে আয়শা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তাঁর এই জয় প্রমাণ করে যে, মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলি লবির প্রভাব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন যে গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে এবং তাঁদের সরকারের উচিত ইসরায়েলে অস্ত্র ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ করা।

আমেরিকার এই স্বপ্ন পূরণের গল্প কেবল আয়শার একার নয়। ভারতের তামিলনাড়ুর এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সুন্দর পিচাই, যাঁর শৈশবের একমাত্র ইলেকট্রনিক যন্ত্র ছিল একটি সাদাকালো টেলিভিশন, আজ তিনি গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। একইভাবে, একজন সাধারণ বাংলাদেশি অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে এসে প্রথম সাত বছর ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ করার পর আজ ১২টি ম্যাকডোনাল্ডস ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক হয়েছেন। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, পার্কচেস্টার কিংবা ব্রুকলিনের চার্লস ম্যাকডোনাল্ডের মতো এলাকায় বাংলাদেশিরা নিজেদের পরিশ্রম দিয়ে গড়ে তুলেছেন এক টুকরো বাংলাদেশ।

মার্কিন মূলধারার রাজনীতিতেও আজকাল অভিবাসী ও তাঁদের সন্তানদের অংশগ্রহণ এবং সাফল্য চোখে পড়ার মতো। ২০১১ সালে মিশিগান থেকে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কংগ্রেস সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন হ্যানসেন ক্লার্ক। বর্তমানে নুসরাত জাহান চৌধুরী মার্কিন ফেডারেল বিচারপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর হিসেবে শেখ রহমান (জর্জিয়া), নাবিলা ইসলাম (জর্জিয়া), সাদ্দাম সালিম (ভার্জিনিয়া) এবং আবুল খান (নিউ হ্যামশায়ার) নির্বাচিত হয়ে অবদান রাখছেন। উগান্ডা থেকে আসা এক অভিবাসী পরিবারের সন্তান জোহরান মামদানি বর্তমানে নিউইয়র্ক শহরের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং প্রগতিশীল রাজনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এই ধারায় আরও যুক্ত হয়েছেন মিশিগানের ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর পদপ্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ। মিসরীয় অভিবাসী দম্পতির এই সন্তান বর্তমানে জনমত জরিপে তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ৭ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন। আগামী নির্বাচনে জয়ী হলে তিনিই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম মুসলমান সিনেটর। এছাড়া ইলহাম ওমর, রাশিদা তালিব, লতিফ সাইমন ও গাজালা হাশমির মতো মুসলিম প্রার্থীরাও মার্কিন রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন। রিপাবলিকান পার্টি ও ইসরায়েলি লবির ক্রমাগত বিরোধিতা সত্ত্বেও মার্কিন ভোটাররা প্রগতিশীল ও যোগ্য প্রার্থীদের বেছে নিচ্ছেন, যা কেবল আমেরিকার মতো মুক্ত সমাজেই সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করে তিনি এখন গুগলের সিইও, তাঁর তিন বছরের পারিশ্রমিক প্যাকেজ ৬৯২ মিলিয়ন ডলার।