প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭: ৩৪। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়া একটি পুরনো অভিজ্ঞতা। স্বাধীনতার পর সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলেও চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একনায়কতান্ত্রিক শাসন কায়েম করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের আমলে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারে বিরোধী দলের অংশগ্রহণমূলক সংসদ দেখা গেলেও, এরশাদের আমল ও পরবর্তীতে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতির কারণে সংসদীয় রাজনীতির অভিযাত্রা বারবার হোঁচট খেয়েছে। ৯০-এ স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে সংসদীয় রাজনীতির যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা শেখ হাসিনার শাসনামলে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রে রূপ নেয়। তার শাসনামলে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল, যার ফলে শেষ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তার পতন ঘটে এবং তার দল নিষিদ্ধ হওয়ার পথে চলে যায়।
দেড় দশক পর ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া বাংলাদেশের মানুষ নতুন এক ফ্যাসিবাদমুক্ত রাজনীতির প্রত্যাশা করেছিল। বর্তমান সরকারের ছয় মাসের মাথায় তরুণ সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণে সংসদ কিছুটা প্রাণবন্ত মনে হলেও, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছে। সংসদের তৃতীয় অধিবেশন চলাকালীন বিরোধী দলের চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ এবং সংসদ নেতার কঠোর হুঁশিয়ারি রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও দলের প্রধান ভবিষ্যতে সংসদে যাওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করার কথা জানিয়েছেন, যা সংসদীয় রাজনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ।
জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিরোধী দল অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। ডেপুটি স্পিকারের পদ প্রত্যাখ্যান করে তারা মূলত সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে নিজেদের ভিন্ন বার্তা স্পষ্ট করেছে। এছাড়া জাতীয় সংসদের ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত এবং ১১টি সংসদ-সংক্রান্ত। এখন পর্যন্ত ৩৬টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদে ৫০টি কমিটির মধ্যে বিরোধী দল তাদের আসনসংখ্যা অনুযায়ী ১০টিসহ মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কথা। তবে তারা এখন পর্যন্ত শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতির পদ পেয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেওয়ার শর্তে স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও, বিরোধী দল এই ধরনের 'ক্যারট অ্যান্ড স্টিক' বা মুলো ঝোলানোর রাজনীতি গ্রহণ করতে নারাজ।
সংসদীয় বিতর্কের বাইরে গিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের কোণঠাসা করার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য নিয়ে বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। ২৭ আগস্ট সংসদে দেওয়া বক্তব্যে বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে একে 'পার্লামেন্টারিয়ান ফ্যাসিজম' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তারা সংসদে কোনো শিক্ষকের ছাত্র হতে আসেননি।
সংবিধান সংশোধন ও সংসদীয় কমিটি নিয়ে এই দূরত্ব ও অবিশ্বাস আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষ চায় সংসদই হোক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ক্ষমতাসীন দলকে উদারতা দেখাতে হবে এবং বিরোধী দলকেও সহনশীলতার পথ বেছে নিতে হবে। যদি কোনো পক্ষ 'পয়েন্ট অব নো রিটার্নে' পৌঁছে যায়, তবে রাজনীতি সংসদ ছেড়ে রাজপথে গড়াবে, যা শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানের পরাজিত শক্তির জন্যই সুবিধা বয়ে আনবে।

