জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার নিয়ে গত ১৫ মাসে দুই ধরনের বিপরীতমুখী বক্তব্য পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের ২৫ মে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেছিলেন যে, অন্তর্বর্তী সরকার হঠাৎ করেই এনবিআরের ওপর সংস্কার চাপিয়ে দিয়ে রাজস্ব আদায়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। অথচ গত ২৩ আগস্ট মাননীয় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এনবিআর দুই ভাগ করা হবে এবং অন্তর্বর্তী সরকার এই কাজটি আধাআধি করে রেখে গিয়েছিল। বিএনপির মতে, ২০২৫ সালে এনবিআরের নীতি এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করে দুটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা ছিল অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর অথচ ২০২৬ সালে সেটা হয়ে গেল অর্থনীতির জন্য অনিবার্য। এই দুই বক্তব্যের ব্যবধান মাত্র ১৫ মাসের।
২০২৫ মে এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি আলাদা বিভাগ করার অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এর আগে অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ, আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল। কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে সেপ্টেম্বর মাসে অধ্যাদেশটি সংশোধন করে রাজস্ব ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরই নতুন দুই বিভাগের শীর্ষ পদে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয় এবং ২১ জানুয়ারি কার্যবিধি সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। তাই একে ‘চাপিয়ে দেওয়া’ বলার সুযোগ নেই, বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছিল।
অচলাবস্থার দাবিটিও তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র আড়াই শতাংশ, যা মূলত আন্দোলন ও কর্মবিরতির কারণে ঘটেছিল। কিন্তু সংস্কারকাঠামোর প্রথম পূর্ণ বছর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের গুটিকয় দেশের একটি, যেখানে করহার নির্ধারণ, আদায় এবং নিরীক্ষা একই কর্মকর্তাদের হাতে থাকে। এই স্বার্থের সংঘাতই মূলত ঘুষ ও রাজস্ব লিকেজের উৎস।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন সংস্কার ‘আধাআধি’ অবস্থায় ছিল। প্রকৃতপক্ষে সংসদ কার্যকর হওয়ার পর অধ্যাদেশ দুটিকে আইনে রূপান্তর না করায় সেগুলো বিলুপ্ত বলে গণ্য হয়েছে। এটি সংসদের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় ছিল, কিন্তু বিএনপি কেন তা করেনি তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়। এছাড়া ২৮ এপ্রিল গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির প্রতিবেদন আজও আসেনি।
বিদেশে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায় আলাদা রাখার রীতি প্রচলিত। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এই ব্যবস্থা সফল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যারা এই বিভাজনের বিরোধিতা করেছিলেন, তারা এখন আইএমএফের ঋণের শর্তের মুখে পড়ে এটি মানতে বাধ্য হচ্ছেন। যদি এটি ভালো সংস্কার হয় তবে বিরোধিতা কেন, আর মন্দ হলে ঋণের প্রয়োজনে মেনে নেওয়া কেন—এই প্রশ্নগুলো থেকেই যায়। আর নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায় একই হাতে রাখার আগ্রহ কার স্বার্থে, তা সবার জানার অধিকার আছে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২৭) ৬ লাখ কোটি টাকার লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, যা গত বছরের প্রকৃত আদায়ের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি।
চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি। অথচ আয়কর বিভাগে ১২ হাজার ৭৬৪টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৪ হাজার ৫৫২টি শূন্য, যা মোট পদের প্রায় ৩৬ শতাংশ। বিদ্যমান ডিজিটাল সিস্টেমগুলো পরস্পর সংযুক্ত নয়। শুল্ক খাতে ২৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া এবং ৭৭ হাজার কোটি টাকার অব্যাহতি রয়ে গেছে। সবশেষে, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন রয়েছে: এনবিআর দুই ভাগ করার আইন কবে সংসদে উঠবে, ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির রোডম্যাপ কী এবং ২৮ এপ্রিল গঠিত কমিটির প্রতিবেদন কবে প্রকাশিত হবে। জনগণ জানতে চায়, এই সংস্কার কি সৎ রাজনৈতিক প্রত্যয় থেকে, নাকি কেবল ঋণের কিস্তির প্রয়োজনে?

