মিরপুরে কাজির বিরুদ্ধে ভুয়া জিডি ও জালিয়াতির ভয়ংকর অভিযোগ

রাজধানীর মিরপুর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) মো. আজিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ভয়ংকর জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি থানার ভুয়া জিডি (সাধারণ ডায়েরি) তৈরির পাশাপাশি সরকারি দপ্তরের সিল নকল এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জালিয়াতি করছেন। পার্শ্ববর্তী ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাজি মো. মোজাম্মেল হকসহ অন্যান্য কাজিদের হেনস্তা ও শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যেই তিনি এসব অনৈতিক ও বিপজ্জনক পথ বেছে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রূপ বদলানো কাজি আজিজের পেছনে কাজ করছে এক বিশাল সিন্ডিকেট। জেলা রেজিস্ট্রি অফিস ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের গোপনীয় সিল এবং কর্মকর্তাদের সই জাল করে তিনি তৈরি করছেন ভুয়া সব নথিপত্র। উদ্দেশ্য—অন্য কাজীদের ভয় দেখিয়ে কোণঠাসা করা ও নিজের প্রভাব বিস্তার করা। প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট মিরপুর মডেল থানায় ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর-২১৭৮) করা হয়েছে বলে দাবি করেন আজিজুর রহমান। জিডিতে তিনি অভিযোগ তোলেন, মোজাম্মেল হক তার এখতিয়ারভুক্ত সেকশন-১০ ও ১১ এলাকায় অনধিকার প্রবেশ করে বিয়ে নিবন্ধন করেছেন এবং প্রতিবাদ করলে গালিগালাজ করেছেন।

তবে থানার নথিপত্রে এই জিডির কোনো অস্তিত্ব নেই। জিডির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নাম থাকা এসআই মো. আজিজুল হক জানান, ২০২৩ সাল থেকেই থানায় সব জিডি অনলাইনে হচ্ছে, অফলাইন বা হাতে লেখা কোনো জিডির সুযোগই নেই। তিনি বলেন, ৫০-১০০ টাকা দিয়ে বাইরে থেকে সিল বানিয়ে ভুয়া সই দিয়ে উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে এটি করা হয়েছে। আমার নামে এমন কোনো জিডির বার্তা কখনো আসেনি। একইভাবে তেজগাঁওয়ের জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে কাজী মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে আজিজুর রহমানের জমা দেওয়া একটি অভিযোগপত্র নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, নথিপত্রে এমন কোনো ফাইলের তথ্য নেই। অভিযোগপত্রে থাকা তথাকথিত ‘রিসিভ’ সিল ও সই দেখালে সেখানকার অফিস সহায়ক মো. বাবুল মিয়া বলেন, ‘এই সিল ও স্বাক্ষর আমার নয়। আমরা এমন কোনো অভিযোগপত্র গ্রহণ করিনি।’

থানার ভুয়া জিডি তৈরি, সরকারি দপ্তরের সিল নকল এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ক্ষ্যান্ত হননি চতুর নিকাহ রেজিস্ট্রার আজিজুর রহমান। এসব ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টে একটি রিট (নম্বর: ৯০৬৫/২০২৬) দায়ের করেন তিনি। রিটে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের প্রতি কাজী মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়েছিল। অভিযোগে বলা হয়, কাজী মোজাম্মেল হক মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯-এর ১১ নম্বর বিধি লঙ্ঘন করে কাজ পরিচালনা করছেন। তবে তার প্রতারণা ও জালিয়াতির নথিপত্র প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে—এমন তথ্য জানতে পেরে কাজি আজিজ তার রিট আবেদনটি সম্প্রতি প্রত্যাহার করে নেন বলে সূত্রে জানা গেছে।

মিরপুর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাজি ড. এএস কাদির কিবরিয়া অভিযোগ করেন, আজিজুর রহমান ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নিজের সহকারীর মাধ্যমে অন্যান্য এলাকায় গিয়ে অবৈধভাবে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন করছেন। আগে আওয়ামী লীগের পরিচয়ে চললেও পটপরিবর্তনের পর তিনি এখন বিএনপি সেজে বসেছেন। তিনি সব জায়গায় অনৈতিক লেনদেন করে পার পেয়ে যান বলে সাধারণ মানুষ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না। এ বিষয়ে কাজী মো. আজিজুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রথমে জালিয়াতির বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়ে দাবি করেন, এসব অনেক আগের কথা, ‘ঝামেলা মিটে গেছে।’ থানায় হাতে লেখা জিডি কেন করা হলো—জানতে চাইলে তিনি অবাস্তব দাবি করে বলেন, ‘থানায় অনলাইন-অফলাইন দুভাবেই জিডি হয়।’ তবে কাজি মোজাম্মেল হকের সঙ্গে আপস হয়ে গেছে বলে দাবি করলেও তিনি এর কোনো প্রমাণ বা আপসনামা দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে, ভুয়া জিডি ও হাইকোর্টের রিটের খবর শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন কাজী মো. মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, ‘কারো সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা নেই। আমার বিরুদ্ধে মামলা ও জিডি করা হয়েছে—তা আপনাদের মাধ্যমেই প্রথম জানলাম।’ ভয়ংকর এই জালিয়াতির হাত থেকে বাঁচতে তিনি সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।