এআই নজরদারিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক: নতুন অবকাঠামোয় বদলের পথে

দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে আরও নিরাপদ, আধুনিক ও যানজটমুক্ত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, এআই ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা, ওভারপাস-আন্ডারপাস নির্মাণ এবং মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এই মহাসড়কের চেহারা বদলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে মহাসড়কে যানবাহনের চলাচলে শৃঙ্খলা বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা ও যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে সময় কমবে এবং দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের শনাক্ত করতে গত ১৮ আগস্ট থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ক্যামেরা ও ‘অটো ফাইন’ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কিলোমিটার মহাসড়ক এই নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। মহাসড়কের ৪৯০টি পয়েন্টে মোট ১ হাজার ৪২৭টি এআই ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি অতিরিক্ত গতি, নির্ধারিত লেন না মানা, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং, উল্টো পথে গাড়ি চালানো এবং অবৈধ পার্কিংসহ বিভিন্ন অনিয়ম শনাক্ত করা হচ্ছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণস্বরূপ। এই মহাসড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা কমিয়ে মানুষের যাতায়াত আরও নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, এআই ক্যামেরা ও অটো ফাইন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। এর ফলে চালকদের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়বে এবং দুর্ঘটনা কমাতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এআই ক্যামেরাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা চালুর পর প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই ৪৪৯টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ১৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর অভিযোগে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে। মামলা হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট গাড়ির নিবন্ধিত মালিকের মোবাইল নম্বরে এসএমএসের মাধ্যমে তথ্য ও জরিমানার নোটিশ পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে জরিমানার অর্থ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। একজন চালক বা গাড়ির মালিককে হয়রানি না করে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। তিনি আরও জানান, নিয়মিত নজরদারির ফলে চালকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে এবং ধীরে ধীরে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের প্রবণতা কমে আসবে।

শুধু ট্রাফিক আইন প্রয়োগ নয়, মহাসড়কের সক্ষমতা বাড়াতেও বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর আওতায় আরও তিনটি আন্ডারপাস নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে যানজটপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত পদুয়ার বাজার এলাকার যানজট নিরসনে বিদ্যমান ওভারপাস সম্প্রসারণের জন্য নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। পদুয়াবাজারসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় যানজট ও দুর্ঘটনা কমাতে পাঁচটি আন্ডারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ২৩২ কিলোমিটার পুরোটাই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর করার ডিজাইন সম্পন্ন হয়েছে এবং অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত হলে ডিপিপি প্রণয়ন করা হবে।