ইয়াবা পাচার রুখতে সীমান্তে এআই ক্যামেরা ও স্থায়ী তল্লাশিচৌকির প্রস্তাব পুলিশের

মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবা চোরাচালান বন্ধে এক অভিনব ও আধুনিক প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে পুলিশ। কক্সবাজার ও বান্দরবানের মাদক পাচারের প্রধান রুটগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিসম্পন্ন মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরা, ডগ স্কোয়াড এবং অত্যাধুনিক স্ক্যানারসহ ১১টি স্থায়ী তল্লাশিচৌকি স্থাপনের একটি প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। গত ২৭ জুলাই চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবটি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়।

সীমান্তে নজরদারি সত্ত্বেও মাদককারবারিরা প্রতিনিয়ত রুট ও কৌশল পরিবর্তন করায় ইয়াবার বিস্তার পুরোপুরি রোধ করা যাচ্ছে না। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ১ কোটি ৫১ লাখ ৩৪ হাজার ৯৪৫টি এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ৪ কোটি ৩৫ লাখ coercion ৬২ হাজার ৮১১টি ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করেছে। এই বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দের পরও পাচার বন্ধ না হওয়ায় সীমান্ত থেকে শহর পর্যন্ত পুরো রুটকে কড়া নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপুলিশ পরিদর্শক মো. নাজিমুল হক কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্ত এলাকা ঘুরে এই প্রস্তাবটি তৈরি করেছেন। তিনি জানান, সন্দেহভাজন ইয়াবা কারবারি ও তাদের সহযোগীদের ছবি এআই সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকবে। তারা তল্লাশিচৌকিতে প্রবেশ করলেই এআই ক্যামেরা তাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করবে। এছাড়া গাড়ি ও লাগেজে লুকিয়ে রাখা মাদক খুঁজে বের করতে ব্যবহার করা হবে বিশেষ স্ক্যানার। যদি সেখানেও ধরা না পড়ে, তবে ডগ স্কোয়াডের সাহায্য নেওয়া হবে। এই পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে এবং ৩২১ জন পুলিশ সদস্য চাওয়া হয়েছে।

পুলিশের এই পরিকল্পনায় কক্সবাজারের রামু, সদর, উখিয়া ও চকরিয়ায় সাতটি এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের ভাঙ্গার মোড়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে, যা মেরিন ড্রাইভের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। কক্সবাজার শহর ও পর্যটন এলাকায় ইয়াবা ঢোকা ঠেকাতে এখানে বড় ধরনের নজরদারিবলয় তৈরির পরিকল্পনা করেছে পুলিশ। এখানে ৪২ জন পুলিশ সদস্যের একটি বড় দল তিন পালায় দায়িত্ব পালন করবে। এই চৌকিতে ৩টি এআই ক্যামেরা, ১৫টি সিসিটিভি, ১টি ডগ স্কোয়াড, ১টি লাগেজ স্ক্যানার ও ১টি ভেহিক্যাল স্ক্যানার থাকবে। এছাড়া ৫০০ বর্গফুটের সেমি পাকা ভবন ও আরসিসি পার্কিং পেভমেন্ট নির্মাণে ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে।

অন্যান্য প্রস্তাবিত স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে রামুর রাংকুট বৌদ্ধবিহার ও পনেরো ছড়া ফরেস্ট অফিস, চৌফলদণ্ডী লোহার সেতু ও রেলস্টেশন, উখিয়ার কোর্ট বাজার সড়ক এবং চকরিয়ার হারবাং সড়ক। নাইক্ষ্যংছড়িতে রয়েছে বেইলি সেতু, সোনাইছড়ি চৌরাস্তার মোড়, বাইশারী পেটান আলীপাড়া মোড় এবং রামুর গর্জনিয়ার ডাকবাংলো মোড়। পুরোনো সড়ক ও পাহাড়ি পথগুলো নজরদারির আওতায় আনতে উখিয়ার পনেরো ছড়া ফরেস্ট অফিস-কাটিয়ার মাথা এলাকায় ৩৩ সদস্যের চেকপোস্ট এবং রামুর রাংকুট বৌদ্ধবিহারে বিশেষ নজরদারির প্রস্তাব করা হয়েছে। গর্জনিয়ার ডাকবাংলো মোড়কে বনাঞ্চলঘেরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সংযোগস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তসংলগ্ন পাহাড়ি ছোট ছোট রাস্তা দিয়ে মাদক আসার আশঙ্কায় সেখানে তিনটি স্থায়ী তল্লাশিচৌকি বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো হলো বেইলি সেতু, সোনাইছড়ি ইউনিয়নের চৌরাস্তার মোড় এবং বাইশারী পেটান আলীপাড়া মোড়। প্রতিটি তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের ৩৩ জন সদস্য রাখার প্রস্তাব রয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়ি থানা থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাইশারী পেটান আলীপাড়া মোড় মাদক পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে সোনাইছড়ির চৌরাস্তা চারটি সড়কের সংযোগস্থল হওয়ায় সেখানে যানবাহন তল্লাশি করা সহজ হবে বলে মনে করছে পুলিশ।

প্রস্তাব অনুযায়ী, এই ১১টি চেকপোস্টে মোট ৩১টি এআই-ভিত্তিক মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরা এবং ১৪০টি সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে। এর সঙ্গে থাকবে ৬টি ভেহিক্যাল স্ক্যানিং মেশিন ও ৮টি লাগেজ স্ক্যানার। ৬টি ভেহিক্যাল স্ক্যানিং মেশিনের প্রতিটির দাম ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ধরে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ৮টি লাগেজ স্ক্যানারের প্রতিটির দাম ৪৫ লাখ টাকা হিসাবে মোট ব্যয় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এছাড়া এআই ফেস ডিটেকশন সফটওয়্যারের জন্য ৫ লাখ এবং ২৩টি ৬৫ ইঞ্চি টেলিভিশনের জন্য ২৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে।

এই উদ্যোগের বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান নয়, পাচারের রুটগুলো বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি পথ বন্ধ হলে কারবারিরা অন্য পথ খোঁজে, তাই রেল, সড়ক ও পাহাড়ি পথসহ সব জায়গায় সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন। এই প্রযুক্তিগত প্রস্তাবটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার বলে তিনি মনে করেন। এদিকে, প্রস্তাবটির বর্তমান অবস্থা জানতে অতিরিক্ত ডিআইজি মাহবুবুল করিমের মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সীমান্তের পর ইয়াবা পাচারের পথগুলোতে একাধিক নজরদারিবলয় তৈরি হবে, যা শহরে পৌঁছানোর আগেই মাদক আটকে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।