নোয়াখালীতে পৌনে ৮ কোটি টাকার সড়ক দুই মাসেই বেহাল

২০২৬ (2026) সালের ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নোয়াখালীতে পৌনে আট কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা লক্ষ্মীপুর-দত্তপাড়া-চাটখিল-খিলপাড়া সড়কের কাজ শেষ হওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায় চরম বেহাল দশা সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই নতুন এই সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গিয়ে খানাখন্দ, ফাটল এবং গর্ত তৈরি হয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় সড়কটি দেবে গিয়ে পার্শ্ববর্তী খাল ও জমিতে ধসে পড়ার উপক্রম হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রী এবং যানবাহন চালকেরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে প্রকল্পের টাকা হরিলুট করা হয়েছে।

সওজ সূত্রে জানা গেছে, চাটখিল-খিলপাড়া সড়কের প্রায় ৭ কিলোমিটার অংশ মেরামতের জন্য ৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজটি পেয়েছিল ঢাকার মিরপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সেলিম এন্ড ব্রাদার্স এন্ড নুরুজ্জামান ইঞ্জিনিয়ারিং ফাউন্ডেশন জেবি। তবে মাঠপর্যায়ে কাজটি সম্পন্ন করেন নোয়াখালীর স্থানীয় ঠিকাদার মোরশেদ আলম।

স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ এক দশকে এই সড়কে কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি, যার ফলে এটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘ ১০ বছর পর স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে মানুষের মনে স্বস্তি ফেরে। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই সড়কটির এই করুণ দশা দেখে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, কার্যাদেশ ও নিয়ম মেনে কাজ করা হয়নি। কাজ শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পাথরের ওপরের কালো বিটুমিনের আবরণ উঠে গিয়ে সড়কের অনেক অংশ ধূসর হয়ে গেছে। বিটুমিন ও পাথরের ৪০ মিলিমিটার পুরুত্বের ঢালাই দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ মিলিমিটার। এছাড়া নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে গাইড ওয়াল নির্মাণ করে মাটি ভরাট ও রোলার দিয়ে ম্যাকাডম করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। গাইড ওয়াল না করায় ইতিমধ্যেই ১২-১৩টি স্থানে সড়ক ধসে পড়েছে, যা বর্তমানে বালুর বস্তা ও কালো পলিথিন দিয়ে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখা হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হলে পুরো সড়ক খালের মধ্যে ধসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিম্নমানের বিটুমিনযুক্ত পাথর ব্যবহার করায় হাতের টানেই পাথর উঠে আসছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

আব্দুল হান্নান নামের এক সিএনজি চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এই ভাঙা রাস্তা নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন কষ্ট করেছি। আশা ছিল নতুন রাস্তা হলে কষ্ট দূর হবে, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে কাজ শেষ হওয়ার আগেই রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ করা হয়েছে।" সড়কে চলাচলকারী কফিল উদ্দিন ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, ঠিকাদার প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূর থেকে বিটুমিন ও পাথর মিক্স করে এনে কাজ করেছেন এবং অত্যন্ত নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার করায় সড়কটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার মোরশেদ আলম দাবি করেন, সড়কটি এলজিইডি থেকে এসেছে। তাঁর কার্যাদেশে ১০৭ মিটার গাইড ওয়াল নির্মাণের কথা থাকলেও তিনি ১৮৬ মিটার নির্মাণ করেছেন। এছাড়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর নিয়মবহির্ভূতভাবে রাস্তার পাশে প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ খুঁড়ে পানির পাইপলাইন বসিয়েছে এবং রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটি পুকুর থাকায় সড়ক দেবে গেছে। এই কাজে তাঁর প্রায় ৬০ লাখ টাকা লোকসান হবে দাবি করে তিনি বলেন, গত কয়েকদিন ধরে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো মেরামত করে দিচ্ছেন।

এ বিষয়ে নোয়াখালী সওজ-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম প্রথমে তথ্য দিতে গড়িমসি করলেও পরে স্বীকার করেন যে, কাজে নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারসহ কিছু অনিয়ম হয়েছে। বৃষ্টির কারণে এই সমস্যা হয়েছে এবং বর্তমানে তাঁরা পুনরায় মেরামত কাজ করছেন। সওজ-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সফিকুল ইসলামও অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ভারী বৃষ্টির কারণে কাজের ক্ষতি হয়েছে। এই কাজের তিন বছরের 'ডিফেক্ট লায়াবিলিটি' রয়েছে, যার ফলে এই সময়ের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তা নিজ দায়িত্বে মেরামত করতে বাধ্য থাকবে।

নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী সফিকুল ইসলাম জানান, চাটখিল-খিলপাড়া সড়কের প্রায় ৭ কিলোমিটার অংশ মেরামতের জন্য ৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজটি পান মেসার্স সেলিম এন্ড ব্রাদার্স এন্ড নুরুজ্জামান ইঞ্জিনিয়ারিং ফাউন্ডেশন জেবি নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ১৯/বি, উত্তর টোলারবাগ (প্রথমতলা), মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬। তবে কাজটি করেন নোয়াখালীর ঠিকাদার মোরশেদ আলম।