গেন্ডারিয়া কমিউনিটি সেন্টারে ২৩ অনুষ্ঠানের টাকা গায়েব, ডিএসসিসির মামলার সিদ্ধান্ত

গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রে চার মাসে অনুষ্ঠিত ২৩টি অনুষ্ঠানের ভাড়া ও আনুষঙ্গিক ফি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তহবিলে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। দুই খাতার হিসাব মেলাতে গিয়ে এই গরমিল ধরা পড়ে, যেখানে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা গায়েব হওয়ার তথ্য মিলেছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করাসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ।

ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ নথিপত্র অনুযায়ী, গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেয়ারটেকারের রেজিস্টারে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ১৩১টি অনুষ্ঠান আয়োজনের তথ্য রয়েছে। এই অনুষ্ঠানগুলো থেকে হল ভাড়া বাবদ ৩৬ লাখ ৮০ হাজার ৯০০ টাকা জমা দেওয়ার হিসাব দেখানো হয়েছে। তবে একই সময়ে ডেকোরেটর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের খাতা যাচাই করে দেখা যায়, সেখানে মোট ১৫৪টি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ, অন্তত ২৩টি অনুষ্ঠানের কোনো হিসাব কেয়ারটেকারের রেজিস্টারে তোলা হয়নি। এই অনুষ্ঠানগুলো ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চের বিভিন্ন দিনে ও রাতে নিচতলা এবং দ্বিতীয় তলা ব্যবহার করে সম্পন্ন হয়েছিল। এমনকি একই দিনে একাধিক অনুষ্ঠান হওয়ার প্রমাণও ডেকোরেটরের নথিতে পাওয়া গেছে।

নিয়ম অনুযায়ী, ডিএসসিসির কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র বিনামূল্যে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। হল ভাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ (এসি), পানি ও ভ্যাট বাবদও নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়। গায়েব হওয়া এই ২৩টি অনুষ্ঠান থেকে ডিএসসিসির কত টাকা পাওয়ার কথা ছিল, তা নথিতে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা না হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব অনুষ্ঠান বাবদ প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছিল, যার কোনো হদিস মিলছে না। ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে হল ভাড়া, বিদ্যুৎ ও পানির বিল, এসি বিল এবং ভ্যাটসহ পুরো টাকা আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

এই আর্থিক অনিয়মের পেছনে গেন্ডারিয়া সামাজিক কেন্দ্রের তদারকির দায়িত্বে থাকা সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান এবং তত্ত্বাবধায়ক অমরেশ মন্ডল রতনের নাম উঠে এসেছে। ডিএসসিসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, হিসাবের বাইরে থাকা ওই ২৩টি অনুষ্ঠানের টাকা তাঁদের পকেটেই গেছে। তবে করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ নথিতে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করে পদবি ধরে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা, সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা ও কেয়ারটেকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে সাময়িক বরখাস্ত করার কথাও বলা হয়েছে।

অভিযুক্ত সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। ডিএসসিসির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে সাইদুর রহমান নিজেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন, যার কারণে অনেকে তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান। অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাইদুর রহমানকে মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি গাড়ি থেকে নেমে কথা বলবেন বলে জানান, কিন্তু পরে আর ফোন ধরেননি। অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক অমরেশ মন্ডল এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে গেন্ডারিয়া সামাজিক কেন্দ্রের একটি সূত্রের দাবি, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ মাসের মধ্যে বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের অনুষ্ঠান হয়েছিল, যেগুলোর টাকা আদায় করা সম্ভব হয়নি। আরেকটি সূত্র দাবি করেছে, করপোরেশনের একটি পক্ষ বর্তমানে দায়িত্বরতদের ফাঁসাতে ফাঁদ পেতেছে এবং তাতে কয়েকজন কর্মকর্তা আটকে গেছেন।

এই অনিয়মের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির administrator (প্রশাসক) আবদুস সালাম বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হবে এবং কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে খুব শিগগিরই অনলাইনে বুকিং পদ্ধতি চালু করা হবে।