মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা ও হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। অতীতের নানা তিক্ত ও ভালো অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে এবার রাষ্ট্রপতি মনোনয়নে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিতে যাচ্ছে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারকরা তাড়াহুড়া না করে সময় নিয়ে দেশের সবচেয়ে যোগ্য, দক্ষ, সাহসী এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে এই পদে দেখতে চান। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর নির্ভর করলেও দলীয় ফোরামে আলোচনার মাধ্যমেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি কেমন রাষ্ট্রপতি চায়, তা নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রেখে দেশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে এই দায়িত্বে নিয়ে আসার বিষয়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও একই সুর মিলিয়ে বলেন, বিএনপি এমন একজন দক্ষ, বিজ্ঞ ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেবে, যার দেশের প্রতি গভীর আনুগত্য রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিগত ১৮ বছর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হওয়া বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
দলীয় সূত্র মতে, রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিএনপি মূলত তিনটি বিষয় বিবেচনা করছে—দেশ ও দলের প্রতি বিশ্বাস, দক্ষতা ও প্রজ্ঞা এবং সংকটকালীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস। অতীতে ১৯৯৬ সালের মে মাসে বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রপতি থাকাকালে আবদুর রহমান বিশ্বাসের সাহসিকতার কারণে তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের একটি অভ্যুত্থান চেষ্টা নস্যাৎ হয়েছিল। অন্যদিকে, ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের আনুগত্য থাকলেও অদক্ষতা ও সাহসের অভাবে দেশে এক-এগারোর জরুরি সরকার ক্ষমতায় আসে, যা বিএনপির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।
এছাড়া ২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি হওয়া অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ঘটনাটিও দলটির জন্য একটি বড় শিক্ষা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা না জানানো এবং তাকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ না করাসহ বিভিন্ন কারণে মাত্র সাত মাসের মাথায় ২০০২ (2002) সালের ১৯ ও ২০ জুন বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় তাকে ‘ইমপিচ’ করার সিদ্ধান্ত হলে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। গত ৫ অক্টোবর ২০২৪-এ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ও তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরী বিএনপিবিরোধী অবস্থানে ছিলেন। বিএনপির এক প্রবীণ স্থায়ী কমিটির নেতা জানান, বি. চৌধুরী ও ইয়াজউদ্দিনের অতীত অভিজ্ঞতার কারণে এবার রাষ্ট্রপতি বাছাইয়ে কোনো ভুলের সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, বিগত রাষ্ট্রপতিদের যোগ্যতা ও মর্যাদা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। এবার দেশের স্বার্থে একজন সৎ, মর্যাদাসম্পন্ন ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করা উচিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, সংকটের সময় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই দলীয় অন্ধ আনুগত্যের বাইরে গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রাষ্ট্রপতিকে হতে হবে খাঁটি দেশপ্রেমিক, দলনিরপেক্ষ এবং বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অনড়। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না দেশের প্রকৃত অভিভাবক হতে পারেন এমন কাউকে রাষ্ট্রপতি করার তাগিদ দিয়ে বলেন, জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু উচ্চকক্ষ না থাকায় তা আগের নিয়মেই হবে। বিগত ২২ জন রাষ্ট্রপতির ইতিহাস ও সদ্য বিদায়ি মো. সাহাবুদ্দিনের বিতর্কিত ভূমিকার কথা মাথায় রেখে এবার কোনো বিতর্ক এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বিএনপি।

