সরকারের উচ্চপর্যায়ের ইচ্ছায় আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার ভার আবারও পুরোনো উদ্যোক্তাদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই পুনর্গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকটির মূল নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছে চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপের হাতে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যেখানে কেডিএস গ্রুপও সক্রিয় ছিল। ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পর্ষদ ভেঙে দিয়ে স্বতন্ত্র পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেছিল, যার চেয়ারম্যান ছিলেন লংকাবাংলা ফিন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা শাহরিয়ার। স্বতন্ত্র পরিচালকদের সময়ে নিরীক্ষায় বিভিন্ন অনিয়ম উঠে এসেছিল।
নতুন পর্ষদ গঠনের পর ব্যাংকটির নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন পর ব্যাংকে ফিরে এসে তাঁর মূল দায়িত্ব ব্যাংকটিকে পেশাদারির সঙ্গে পরিচালনা করা এবং নতুন করে কোনো অনিয়ম হতে না দেওয়া। তিনি আরও জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগে যাঁদের চাকরি গেছে, তাঁদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। তবে পর্ষদ পুনর্গঠনের পরপরই নিযুক্ত পরিচালকদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি নবগঠিত পর্ষদের প্রথম সভাতেও এসব বিতর্কিত কর্মকর্তার কয়েকজনকে দেখা গেছে। একই সঙ্গে একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারধারীদের মধ্য থেকে যে ১৪ জনকে পর্ষদে নিয়োগ দিয়েছে, তাদের মধ্যে ৬ জনই কেডিএস গ্রুপ ও এর নেতৃত্বের আত্মীয়স্বজন। এর মধ্যে রয়েছেন খলিলুর রহমান, সেলিম রহমান, আহমেদুল হক, মাহবুব আহমেদ, ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম। তবে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী এক পরিবার থেকে তিনজনের বেশি পরিচালক থাকার সুযোগ না থাকায় ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম পদ গ্রহণ করেননি। তাদের পরিবর্তে খন্দকার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদকে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ লাবু ও সেলিম রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়ম করে বিলাসবহুল মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি কেনার তথ্য উঠে এসেছে কেপিএমজির নিরীক্ষায়। ২০২২ সালের ১৫ জুন ব্যাংকের ৩৭৪তম পরিচালনা পর্ষদ সভায় সেলিম রহমানের জন্য এক কোটি টাকা সীমার গাড়ি কেনার অনুমোদন থাকলেও ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে মার্সিডিজ কেনা হয়। একইভাবে ২০২৩ সালের আগস্টে আবদুস সামাদের জন্য ৩ কোটি ২৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকায় আরেকটি মার্সিডিজ কেনা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তির কারণে গাড়ি দুটি বর্তমানে ব্যাংকের হেফাজতে আনা হয়েছে। এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের দায়িত্বে থাকাকালে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানকেও আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের পরিচালক করা হয়েছে।
১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের গত ডিসেম্বর শেষে আমানত ছিল ৫৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ ছিল ৫০ হাজার ১২১ কোটি টাকা। ব্যাংকটির ঋণের ১৭ দশমিক ৬১ শতাংশ খেলাপি। উচ্চ খেলাপির কারণে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে শেয়ারধারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি ব্যাংকটি। বর্তমানে ব্যাংকটি জেড ক্যাটাগরিতে রয়েছে এবং ২২৬টি শাখার মাধ্যমে ৫ হাজার ৫৯৩ জন কর্মী নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

