বিজ্ঞানের অমোঘ সত্য ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির নতুন পাঠ

তারুণ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) পড়ার সুযোগ হয়েছিল। এমআইটির ঠিক পরবর্তী বাসস্টপেই অবস্থিত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। সেই সুবাদে হার্ভার্ডের ‘সায়েন্স সেন্টার’ বা বিজ্ঞান কেন্দ্রেও পড়াশোনার সুযোগ মিলেছিল। সেই সময়টা ছিল বিজ্ঞানে ভরপুর। র‍্যাংকিংয়ের হিসাব না বুঝলেও, বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষার এমন অসাধারণ সুযোগ পাওয়ার জন্য আজকের দিনেও কৃতজ্ঞতাবোধ করি। এমআইটির শিক্ষকদের ক্যান্টিনে গেলে যে কোনো সময় ২৫ শতাংশ নোবেল বিজয়ী পাওয়া সম্ভব—এই প্রচলিত ধারণাটি অতিরঞ্জিত মনে হলেও, সেখানকার পরিবেশের একটি ধারণা দেয়।

এমআইটির ছাত্র হিসেবে আমরা সবাই কোনো না কোনো বৈজ্ঞানিক ফিকিরে থাকতাম। আমার সহপাঠী ভিক্টর তার অফিসে ছোটখাটো একটি যুদ্ধবিমান বানিয়েছিল, যা পরে মার্কিন বিমান বাহিনী নিয়ে যায়। আমি নিজেও একবার তারবিহীন ফোনের ধারণা তৈরি করি। এমআইটি, হার্ভার্ড ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি যৌথ গবেষণা প্রকল্পের কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে একটি সেমিনারে আমি আমার এই ধারণার কথা তুলে ধরি। সুইডেনের এরিকসন কোম্পানির এক প্রতিনিধি আমার কথা শুনে নোট করে নিয়েছিলেন। পরের বছরই এরিকসন বিশ্বের প্রথম মোবাইল ফোন চালু করে। যদিও আমি কখনো এর জন্য আর্থিক দাবি বা স্বীকৃতি আশা করিনি, তবে আমার সেই ধারণাটিই যে মোবাইল ফোনের ভিত্তি ছিল, তা পরবর্তী সময়ে বন্ধুদের সাথে আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে। এমআইটির ছাত্রছাত্রীদের পার্শ্ববর্তী হার্ভার্ডের শিক্ষার্থীরা তখন ‘নার্ড’ বা ‘বইপোকা বোকা’ বলে হাসাহাসি করত।

তবে এই বিজ্ঞান জগতের শিখরে গিয়েই আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় একটি ধাক্কা লাগে। সেখানে তুলনামূলক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সিদ্ধান্ত প্রণয়ন পড়তে গিয়ে শিখলাম, বিজ্ঞান কোনো কথাকেই চূড়ান্ত সঠিক বলে প্রমাণ করতে পারে না; বড়জোর কোনো বিষয়কে সাময়িকভাবে সম্ভবত ভুল বা সঠিক বলে প্রমাণ করতে পারে। আরেকটি উদাহরণ দিয়ে আরো পরিষ্কার করা যাক। সলিম মিঞা করিম মিঞা থেকে ১০০ টাকা ধার নিয়েছিল, এখন আর ফেরত দিচ্ছে না। তা আদায় করতে সলিম মিঞা যেখানেই যায়, করিম মিঞা সেখানে গিয়েই হাজির হয়। অথচ সমাজ ও আধুনিক যুগে প্রচলিত ধারণা হলো, যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয় তা কুসংস্কার এবং বিজ্ঞানীরা যা বলেছেন তা সবই নিশ্চিত সত্য। এই ভুল ধারণার কারণে অনেকেই ঐতিহ্য, নীতিকথা বা ধর্মের সাথে বিজ্ঞানীদের তথাকথিত কোনো বক্তব্যের সংঘাত দেখলে ধর্মীয় বা ঐতিহ্যগত বিষয়গুলো বাদ দিয়ে দেয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কারণ হিসেবে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। আগুনে হাত দিলে হাত পোড়ে—এটিকে আমরা কারণিক সম্পর্ক মনে করি। কিন্তু বাস্তবে কোটি কোটি ভিন্ন ঘটনার কারণেও হাত পুড়তে পারে, যা আমাদের চোখের আড়ালে থাকা কোনো রশ্মি বা মহাজাগতিক প্রভাব হতে পারে। একইভাবে, সলিম ও করিমের পাওনা-দেনার সম্পর্ক এবং সলিম ও আনারকলির প্রেমের সম্পর্কের কারণে তিনজন সবসময় একই জায়গায় থাকলে, যারা প্রেক্ষাপট জানে না তারা করিম ও আনারকলির মধ্যে প্রেমের ভুল সম্পর্ক কল্পনা করে বসবে। এটি কেবল ‘সমসাময়িকার সম্পর্ক’ বা কোরিলেশন, কোনো ‘কারণিক সম্পর্ক’ বা ক্যাজুয়াল রিলেশন নয়। তাই ডারউইন বা যে কোনো বিজ্ঞানীর বক্তব্যই হোক না কেন, তা নিশ্চিত সত্য বলে দাবি করার সুযোগ নেই, যদিও অনেক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ তা ভুলভাবে বিশ্বাস করেন।