যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন নজির সৃষ্টি হয়েছে। কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের পর অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দায়িত্ব নেওয়ায় বর্তমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিলিয়ে যুক্তরাজ্যে এখন মোট ১০ জন জীবিত রয়েছেন। আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসে এর আগে একই সময়ে এত জন বর্তমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী জীবিত থাকার রেকর্ড নেই। এই তালিকায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের পাশাপাশি রয়েছেন ৯ জন সাবেক প্রধানমন্ত্রী—কিয়ার স্টারমার, ঋষি সুনাক, লিজ ট্রাস, বরিস জনসন, থেরেসা মে, ডেভিড ক্যামেরন, গর্ডন ব্রাউন, টনি ব্লেয়ার ও জন মেজর। ২০ জুলাই রাজা তৃতীয় চার্লসের আমন্ত্রণে বার্নহ্যাম সরকার গঠন করেন এবং কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হন।
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর ঋষি সুনাক ক্ষমতা ছাড়লে যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো জীবিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সংখ্যা আটে পৌঁছেছিল। এবার কিয়ার স্টারমার সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের তালিকায় যুক্ত হওয়ায় সেই সংখ্যা এখন ৯। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে যোগ করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১০-এ। জীবিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ জন মেজর। ৮৩ বছর বয়সী কনজারভেটিভ পার্টির এই প্রবীণ নেতা ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের নেতৃত্ব দেন। এরপর রয়েছেন গর্ডন ব্রাউন, তাঁর বয়স ৭৫ বছর। তিনি ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। টনি ব্লেয়ারের বয়স ৭৩ বছর; তিনি ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত টানা এক দশক লেবার পার্টি সরকারের নেতৃত্ব দেন। থেরেসা মের বয়স ৬৯ বছর। তিনি ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বরিস জনসনের বয়স ৬২ বছর; তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বকাল ছিল ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল। সদ্য বিদায়ী কিয়ার স্টারমারের বয়স ৬৩ বছর; তিনি ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ডেভিড ক্যামেরনের বয়স ৫৯ বছর। তিনি ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। লিজ ট্রাসের বয়স ৫০ বছর। ২০২২ সালে মাত্র ৪৫ দিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পদত্যাগ করেন। ঋষি সুনাকের বয়স ৪৬ বছর। তিনি ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর সদ্য দায়িত্ব নেওয়া অ্যান্ডি বার্নহ্যামের বয়স ৫৬ বছর।
একই সময়ে এতজন জীবিত সাবেক–বর্তমান প্রধানমন্ত্রী থাকা কেবল একটি পরিসংখ্যানগত রেকর্ড নয়। এটি ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটিশ রাজনীতিতে ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনেরও এক বড় প্রতিচ্ছবি। ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের পর ডেভিড ক্যামেরন, থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক, কিয়ার স্টারমার ও অ্যান্ডি বার্নহ্যামসহ এক দশকের মধ্যে সাতজন প্রধানমন্ত্রী ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করেছেন। ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস), অভিবাসন, আবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। ফলে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নতুন সরকার দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কতটা সফল হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে সবার।
যুক্তরাজ্যে দায়িত্ব ছাড়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের জন্য আলাদা কোনো সাংবিধানিক পদ বা আজীবন সরকারি বেতনের ব্যবস্থা নেই। তবে জনজীবনে তাঁদের বিশেষ অবস্থানের কারণে রাষ্ট্র কিছু সরকারি সহায়তা ও মর্যাদা দিয়ে থাকে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো ‘পাবলিক ডিউটি কস্টস অ্যালাউন্স’ (পিডিসিএ)। ১৯৯১ সালে মার্গারেট থ্যাচারের পদত্যাগের পর এই ভাতা চালু করা হয়। এর আওতায় জনজীবনে সক্রিয় একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয় পরিচালনা, কর্মচারীদের বেতন, প্রশাসনিক সহায়তা, চিঠিপত্র ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সফরের ব্যয় বাবদ বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ১৫ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত দাবি করতে পারেন। তবে এই অর্থ কোনো বার্ষিক বেতন বা ব্যক্তিগত ভাতা নয়। প্রথমে নিজের তহবিল থেকে প্রকৃত ব্যয় করতে হয় এবং পরে প্রয়োজনীয় রসিদ ও প্রমাণের ভিত্তিতে সরকার এই অর্থ ফেরত দেয়। এর বাইরে কার্যালয়ের কর্মীদের পেনশন ব্যয়ের জন্য মূল ভাতার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সহায়তা দাবি করা যায়। তবে এটি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত পেনশন নয়।
প্রধানমন্ত্রীসহ কোনো মন্ত্রী দায়িত্ব ছাড়লে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তাঁর বার্ষিক বেতনের এক-চতুর্থাংশের সমপরিমাণ এককালীন অর্থ (রিডানডেন্সি পেমেন্ট) পাওয়ার বিধান রয়েছে। সাধারণত ৬৫ বছরের কম বয়সী এবং তিন সপ্তাহের মধ্যে আবার মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ না পাওয়া ব্যক্তিরা এই অর্থের জন্য যোগ্য হন। তবে ছয় মাসের কম দায়িত্ব পালন অথবা মন্ত্রী আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘনের কারণে পদত্যাগ করলে নীতিগত জায়গা থেকে এই অর্থ না নেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা মূলত ঝুঁকির ধরন মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। সবাই একই মাত্রার বা আজীবন নিরাপত্তা পাবেন—এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে হুমকির ধরন, তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ড ও যাতায়াতের বিষয়গুলো বিবেচনা করে পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কারণে আলাদা কোনো স্বয়ংক্রিয় আজীবন ‘প্রধানমন্ত্রী পেনশন’ নেই। তবে তাঁরা সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হিসেবে যে পেনশন স্কিমে অবদান রেখেছেন, সেই নিয়ম অনুযায়ী পেনশন পেতে পারেন। দায়িত্ব ছাড়ার পর ১০ ডাউনিং স্ট্রিট কিংবা প্রধানমন্ত্রীর গ্রামীণ সরকারি বাসভবন ‘চেকার্স’ ব্যবহারের অধিকারও শেষ হয়ে যায়। স্থায়ী সরকারি গাড়ি পাওয়ার অধিকারও থাকে না; তবে নিরাপত্তা বা নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে সরকারি পরিবহনের ব্যবস্থা করা হতে পারে। রাজ্যাভিষেক, রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, জাতীয় স্মরণানুষ্ঠান এবং সেনোটাফে ‘রিমেমব্র্যান্স সানডে’র মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের সাধারণত আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে এটি বাধ্যতামূলক কোনো প্রটোকল নয় এবং এই আমন্ত্রণকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধাও বলা যায় না। সাবেক প্রধানমন্ত্রীরা সাধারণত আজীবন প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য থাকেন এবং নামের আগে ‘দ্য রাইট অনারেবল’ মর্যাদা ব্যবহার করতে পারেন। তবে দায়িত্ব ছাড়লেই তাঁরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাউস অব লর্ডসের সদস্য হন না। ১৯০২ সালের পর দায়িত্ব পালন করা ২৫ জন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ১৩ জন পরবর্তী সময়ে হাউস অব লর্ডসের সদস্য হয়েছেন। বর্তমানে ডেভিড ক্যামেরন ও থেরেসা মে হাউস অব লর্ডসের সদস্য হলেও জন মেজর, টনি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাউন, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেখানে স্থান পাননি।

