যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা ১০ দিনের পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইরান বর্তমানে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ খোলা থাকলেও কোনোটিই সহজ বা নিশ্চিত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। এই বাস্তবতাকে ইরান এখন তার অন্যতম প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
ইরানের জন্য সামরিক ব্যয় বিবেচনায় সবচেয়ে সাশ্রয়ী পথ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো। এর জন্য তেহরানকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করে নিরাপদ নৌচলাচলের নিশ্চয়তা দিতে হবে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ বা সীমিত করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে কঠোর পরিদর্শনের অনুমতি দিতে হবে। বিনিময়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ভবিষ্যতে সামরিক হামলার বিরুদ্ধে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইবে।
তবে রাজনৈতিকভাবে এটি ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিকল্প, কারণ হরমুজ প্রণালি এখন তাদের কাছে নতুন প্রতিরোধক্ষমতা বা ডিটারেন্সের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তেহরানের অনেক নীতিনির্ধারকের মতে, প্রথমবারের মতো ইসলামি প্রজাতন্ত্র দেখাতে পেরেছে যে, তাদের ভূখণ্ডে হামলার জবাবে তারা তাৎক্ষণিকভাবে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম।
এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে দীর্ঘদিন ধরে দেশের অবিচ্ছেদ্য সার্বভৌম অধিকার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সামরিক হামলার মুখে এই কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হওয়া দেশটির কট্টরপন্থীদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপের কাছে আত্মসমর্পণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, পারমাণবিক কর্মসূচির পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের শিয়া গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও নতুন দাবি তুলতে পারে।
দ্বিতীয় পথটি হলো সংঘাত আরও বাড়িয়ে তোলা। ইরান চাইলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা বাড়াতে পারে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে আরো আক্রমণ চালাতে পারে এবং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এই কৌশলের লক্ষ্য হবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা, তেলের দাম বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এবং শেষ পর্যন্ত তাদের আলোচনায় বসতে বাধ্য করা।
কিন্তু এটিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প। যদি বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটে অথবা উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়, তাহলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তখন ইরানকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বৃহত্তর একটি সামরিক জোটের মুখোমুখি হতে হবে।
তৃতীয় এবং তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখা। অর্থাৎ, এমন মাত্রায় চাপ সৃষ্টি করা, যাতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি বাজার অনিশ্চিত থাকে। কিন্তু সেই চাপ যেন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পর্যায়ে না পৌঁছে। এটি ইরানের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তেহরানের দৃষ্টিতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে সামরিকভাবে পরাজিত করাই একমাত্র বিজয় নয়; বরং দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারাও একটি বিজয়।
যদি প্রতিপক্ষ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইচ্ছাশক্তি হারায়, তাহলে ইরান নিজেকে সফল বলে দাবি করতে পারে। তবে এই কৌশলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ইরানের অভ্যন্তরে জনগণের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো- ইরান যত বেশি হরমুজকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে, দীর্ঘমেয়াদে তত বেশি বিশ্ব এই জলপথের বিকল্প খুঁজতে শুরু করবে। যদি উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন পাইপলাইন, বিকল্প বন্দর কিংবা নতুন সমুদ্রপথ গড়ে তোলে, তাহলে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব কমে যেতে পারে। তখন ইরানও তার সবচেয়ে কার্যকর চাপ সৃষ্টির অস্ত্র হারাতে পারে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও এই বাস্তবতা স্বীকার করেছেন। তার মতে, হরমুজের প্রকৃত মূল্য জাহাজ চলাচল কমিয়ে দেওয়ায় নয়; বরং বেশি পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এই পথ দিয়ে চলাচল নিশ্চিত করা। যদি জলপথটি স্থায়ীভাবে অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তাহলে বিশ্ব স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প পথ তৈরি করবে।
বর্তমান সংকটকে আরো জটিল করে তুলেছে ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের শুরুতে এক হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের ক্ষমতার কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য কতটা সুসংহত, তা এখনো স্পষ্ট নয়। অতীতে নির্বাচিত সরকার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC)-এর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে সর্বোচ্চ নেতা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতেন।
বর্তমানে সেই কেন্দ্রভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। রাষ্ট্রপতি মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং তার কূটনৈতিক দল অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আলোচনার পক্ষে থাকতে পারেন।
অন্যদিকে পার্লামেন্টের কট্টরপন্থী সদস্য, প্রভাবশালী অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠান এবং রক্ষণশীল গণমাধ্যম মনে করে, বড় ধরনের ছাড় দিলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সরকারের মূল সমর্থকরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ঘিরে রয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসকে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী এবং হরমুজ প্রণালি-ভিত্তিক সামরিক কৌশল মূলত এই বাহিনীর প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল। তবে উত্তেজনা বাড়ানো কিংবা আলোচনায় যাওয়ার সিদ্ধান্তে তাদের প্রকৃত প্রভাব কতটা, তা স্পষ্ট নয়।
রাষ্ট্রের কৌশলগত ধৈর্য এবং সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে, যার উদ্দেশ্য ছিল সামরিক অভিযান বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে।
বিবিসি পার্সিয়ানকে এক ইরানি নারী জানান, যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ায় তিনি গভীরভাবে হতাশ। তিনি আশা করেছিলেন, সমঝোতা দুই পক্ষকে আলোচনার সুযোগ দেবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু এখন তিনি অবকাঠামো ধ্বংস এবং বেসামরিক ও সামরিক প্রাণহানি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তেহরানের আরেক নারী জানান, তিনি একটি বৈদেশিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।
যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা এবং ডক্টরেট ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও গত চার মাস ধরে তিনি বেকার। তার ভাষায়, কেউ নতুন লোক নিয়োগ দিচ্ছে না, কারণ কেউ জানে না সামনে কী ঘটবে। তিনি আরো জানান, দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। নিয়মিত বিদ্যুৎ ও পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। চুরি-ডাকাতি বেড়েছে। রাতে মাঝে মাঝে গুলির শব্দ শোনা যায়। নিরাপত্তার কারণে তিনি শহরের ভেতরে চলাচলও কমিয়ে দিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো দেখায়, বিদেশি হামলা অনেক সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করলেও, একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তা জনগণের ধৈর্যেরও পরীক্ষা নিচ্ছে।
সংকট শুধু ইরানের জন্য নয়; যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সমান জটিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে মূলত তিনটি পথ রয়েছে- যুদ্ধ আরো বড় করা, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা, অথবা কঠোর আন্তর্জাতিক তদারকির অধীনে সীমিত বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালানোর সুযোগ দিয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় যাওয়া। তিনটি পথের কোনোটিই নিশ্চিত সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না।
ইরান আপাতত এমন একটি কৌশল অনুসরণ করছে, যেখানে সীমিত মাত্রার অস্থিরতা বজায় রেখে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। কিন্তু এই নীতিরও একটি স্বাভাবিক সীমা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে হরমুজকে চাপ সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো বিকল্প রুট গড়ে তুলতে পারে, যা ভবিষ্যতে ইরানের কৌশলগত গুরুত্বই কমিয়ে দেবে।
অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনৈতিক সংকট, জনঅসন্তোষ এবং রাজনৈতিক বিভাজনও বাড়বে। একই সময়ে অতিরিক্ত সামরিক উত্তেজনা আবার পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ফলে আগামী কয়েক মাসে সংঘাত, কূটনৈতিক মধ্যস্থতা এবং অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়েই চলবে। শেষ পর্যন্ত মূল প্রশ্ন থেকে যায়, ইরান কতদিন হরমুজকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।

