জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থীদের বড় জয়, ইউরোপ কি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখে?

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)। গত রোববারের এই নির্বাচনের ফল ডাউনিং স্ট্রিট থেকে শুরু করে প্যারিসের এলিসি প্রাসাদ পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জয় আগামী বছরগুলোতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর ক্ষমতায় আসার পথকে আরও প্রশস্ত করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিবাদের পতনের পর থেকে জার্মানি সবসময় কট্টর ডানপন্থীদের ক্ষমতার বাইরে রাখার চেষ্টা করেছে। তবে এবারের ফল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং গত এক দশক ধরে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের ধারাবাহিক উত্থানেরই একটি অংশ।

উন্নত ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপবিষয়ক বিশ্লেষক মুজতবা রহমান বলেন, ‘উন্নত ইউরোপ একধরনের জটিল রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারগুলো মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের সমাধান করতে পারছে না। ভোটারদের চাহিদাও পূরণ করতে পারছে না।’ জার্মানির ভোটারদের মতো ক্ষোভ ও অসন্তোষ এখন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের ভোটারদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা কট্টর ডানপন্থীদের জনতুষ্টিবাদী ও অভিবাসনবিরোধী স্লোগানকে জনপ্রিয় করে তুলছে।

স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের ক্ষমতাসীন মধ্য-ডানপন্থী দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ভোট পেয়েছে এএফডি। তবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে সামান্য পিছিয়ে থাকায় শেষ পর্যন্ত হয়তো তারা সরকার গঠন করতে পারবে না। কারণ, প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য দলগুলো আগেই জানিয়ে দিয়েছে যে তারা এএফডির সঙ্গে কোনো জোট গঠন করবে না। জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থা এএফডিকে ‘সন্দেহভাজন’ উগ্রপন্থী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দলটির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে নাৎসি স্লোগান ব্যবহার এবং হলোকাস্টের গুরুত্ব খাটো করে দেখার অভিযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও, এই ফল চ্যান্সেলর মের্ৎসের নেতৃত্বকে চরম সংকটে ফেলে দিয়েছে, যা ইউরোপে জার্মানির অবস্থানকে আরও দুর্বল করতে পারে।

ফ্রান্সে আগামী বসন্তেই নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ দায়িত্ব ছাড়বেন। দেশটির প্রধান কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র‌্যালির প্রার্থী মারিন লো পেন প্রথম ও দ্বিতীয় দফার জনমত জরিপে বেশ এগিয়ে আছেন। তিনি গত ১৪ বছর ধরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন এবং এবারই প্রথম ক্ষমতার সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ফরাসি ও ইউরোপীয় রাজনীতির অধ্যাপক ফিলিপ মারলিয়ের বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুই দেশেই যে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য টিকে ছিল, তা এখন ভেঙে পড়ার মুখে।’ প্যারিসে কট্টর ডানপন্থী সরকার গঠিত হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বড় ধরনের অস্থিতিশীলতার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, ফ্রান্স পারমাণবিক অস্ত্রধারী একটি বড় দেশ এবং ইইউর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

ইউরোপের অন্যান্য দেশেও একই হাওয়া বইছে। স্পেনে আগামী বছরের আগস্টের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে দুর্নীতি ও অভিবাসনসংকটের কারণে সমাজতন্ত্রী সরকারের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সেখানে পরবর্তী জোট সরকারে কট্টর ডানপন্থী ভক্স পার্টি জায়গা করে নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতালিতে নব্য ফ্যাসিবাদী শিকড় থাকা দল নিয়ে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ইউক্রেন ও ইইউর প্রশ্নে নরম অবস্থান নিলেও, তাঁর চেয়েও ডানপন্থী নেতা রবার্তো ভান্নাচ্চির জনপ্রিয়তা বাড়ায় তিনি অভিবাসন ইস্যুতে আবার কঠোর হচ্ছেন। সম্প্রতি মরক্কো থেকে স্পেনে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রবেশের ঘটনায় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের কঠোর সমালোচনা করেছেন মেলোনি।

যুক্তরাজ্যে কট্টর ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকের উত্থানের মুখে গত জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে সরিয়ে দেয় লেবার পার্টি। তবে দলটির নেতা নাইজেল ফারাজের বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠায় নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার পরিস্থিতি সামলানোর কিছুটা সুযোগ পেয়েছে। রিফর্ম ইউকের অসন্তুষ্ট সদস্য রুপার্ট লো দল ছেড়ে আরও ডানপন্থী নতুন দল গঠন করায় ফারাজের সমর্থকগোষ্ঠীও বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের রাজনীতির অধ্যাপক টিমোথি বেল মনে করেন, এই অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ও আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে ফারাজের পক্ষে সরকার গঠনের মতো সমর্থন পাওয়া কঠিন হবে।

তবে কট্টর ডানপন্থীদের এই অগ্রযাত্রা যে অপ্রতিরোধ্য নয়, তার প্রমাণ মিলেছে হাঙ্গেরিতে। গত এপ্রিলে সেখানে টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর পরাজিত হন কট্টর ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবান। দুর্নীতি, অর্থনৈতিক উদাসীনতা ও ইইউর সঙ্গে বিরোধের কারণে তাঁর দল ফিদেসের এই পরাজয় ইউরোপের মূলধারার রাজনীতিকদের নতুন করে আশাবাদী করেছে। অধ্যাপক টিমোথি বেলের মতে, এএফডির মতো দলগুলো ক্ষমতায় গিয়ে কতটা স্বাভাবিক আচরণ করে এবং দক্ষতার সঙ্গে সরকার চালাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে মূলধারার দলগুলোর উদ্বেগের গভীরতা।

ইউরোপের মধ্যপন্থীরা এখন আশা করছেন, ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে শিক্ষা নেবেন। মুজতবা রহমান বলেন, ‘ইউরোপের চাপে থাকা মধ্যপন্থীরা আশা করছেন, ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্রের অস্থিরতা থেকে শিক্ষা নেবেন। সেই শিক্ষা হলো, মূলধারার বাইরের দল নিয়ে পরীক্ষা করতে গেলে ভুল করার ঝুঁকি থাকে।’ ফ্রান্সে যদি মধ্য-ডান ও মধ্য-বামপন্থীরা বিভক্ত থাকে, তবে দ্বিতীয় দফায় মারিন লো পেনের জয় প্রায় নিশ্চিত। আর সেটি এড়াতে মূলধারার দলগুলোকে একক ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীর পেছনে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।