গ্যাস না পেয়েও ৬২ কোটি টাকার বাড়তি বিলের চাপে ৪ সার কারখানা

গ্যাস সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে দেশের চারটি সরকারি সার কারখানায়। অথচ কারখানার প্ল্যান্ট সচল ও যন্ত্রপাতি রক্ষার জন্য ব্যবহৃত সামান্য গ্যাসের বিল দিতে হচ্ছে নতুন বর্ধিত দরে। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ইউরিয়া সার কারখানার ওপর অতিরিক্ত প্রায় ৬১ কোটি ৭৮ লাখ টাকার বাড়তি বিলের বোঝা চেপেছে। এই বিপুল আর্থিক চাপ কমাতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকা সময়ের জন্য প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ২৯ টাকা ২৫ পয়সার পরিবর্তে আগের ১৬ টাকা করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান ড. মো. মাহমুদুর রহমান সম্প্রতি এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার সময়েও প্ল্যান্ট সংরক্ষণের স্বার্থে চারটি সার কারখানাকে ন্যূনতম গ্যাস ব্যবহার করতে হয়েছে। এই গ্যাসের বিল নতুন বর্ধিত দরে নির্ধারণ করায় বিশাল অঙ্কের বাড়তি ব্যয় তৈরি হয়েছে

সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে চার কারখানায় মোট ৪ কোটি ৬৬ লাখ ২৫ হাজার ৩৮৬ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহৃত হয়েছে। নতুন নির্ধারিত প্রতি ঘনমিটার ২৯ টাকা ২৫ পয়সা দরে যার মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৩৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। তবে আগের ১৬ টাকা দরে এই বিল হিসাব করা হলে খরচ হতো প্রায় ৭৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ, শুধু গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণেই বিসিআইসিকে অতিরিক্ত প্রায় ৬১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।

বিসিআইসি জানায়, ইউরিয়া সার কারখানাগুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলেও গ্যাস ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এসব কারখানায় বিভিন্ন ধরনের ক্ষয়কারী রাসায়নিক ব্যবহৃত থাকায় প্ল্যান্ট দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকলে যন্ত্রপাতিতে দ্রুত মরিচা ধরা ও ক্ষয়ের ঝুঁকি থাকে। তাই মূল্যবান মেশিনারি সংরক্ষণ এবং পরবর্তীতে পুনরায় উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতির জন্য ন্যূনতম গ্যাস ব্যবহার করতে হয়।

চিঠিতে আরও বলা হয়, গ্যাস সংকটের কারণে দেশের চারটি সার কারখানায় দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। তবে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাসহ অন্যান্য নিয়মিত পরিচালনা ব্যয় অব্যাহত থাকে। এর ওপর গ্যাসের নতুন দর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯ টাকা ২৫ পয়সা নির্ধারণ করে, যা ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। এতে গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ।

বিসিআইসির তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার সময়ে ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি, আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড এবং যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে গ্যাস ব্যবহার করতে হয়েছে। কারখানাভেদে এই বন্ধের মেয়াদ ছিল ৩২ থেকে ১৭৩ দিন। উৎপাদন বন্ধ থাকা অবস্থায় এই বর্ধিত দর চাপিয়ে দিলে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর আর্থিক সংকট আরও তীব্র হবে বলে আশঙ্কা করছে বিসিআইসি। তাই বন্ধের সময়টুকুর জন্য বিশেষ বিবেচনায় আগের দরে বিল করার দাবি জানানো হয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে বিসিআইসি জানিয়েছিল, সরকারের নির্ধারিত ১৮ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এই চারটি কারখানা সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি। তবে গ্যাস সংকটের কারণে গত মার্চে পাঁচটি বড় ইউরিয়া কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ হয়ে যায়। কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দৈনিক প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর গত আগস্টে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে।

গ্যাসের এই তীব্র সংকট নিয়ে জুনে জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছিলেন, গ্যাসের সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে সার কারখানায় সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম হওয়ায় বিদ্যুৎ, সার ও শিল্প খাতের প্রয়োজন একসঙ্গে মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বিসিআইসির এই প্রস্তাবটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বিলের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সার উৎপাদন, সরকারি ভর্তুকি এবং আমদানি ব্যয়ের বিষয় জড়িত রয়েছে। তাই গ্যাসের বর্ধিত দরের কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এর আগেও ২০২২ সালে সার কারখানার গ্যাসের দাম ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা করার পর বিসিআইসির বড় অঙ্কের বকেয়া তৈরি হয়েছিল। তখন সরকারিভাবে উৎপাদিত ইউরিয়ার দাম ও উৎপাদন ব্যয়ের পার্থক্য সামাল দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বাণিজ্য ঘাটতি বা ট্রেড গ্যাপ দেওয়ার আবেদন করেছিল সংস্থাটি।