মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি: তীব্র গ্যাস সংকটে অচল ঢাকা ও শিল্পকারখানা

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোতে তীব্র গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংকটে বাসাবাড়ি, গণপরিবহন ও শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারি গ্যাস সংযোগ থাকা সত্ত্বেও রান্নার জন্য গৃহিণীদের বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের পারিবারিক খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে।

বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেকেই বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছেন। ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রায় ২০ দিন ধরে এই সংকট চলছে। শুরুতে জলাবদ্ধতার কারণে পাইপলাইনে পানি ঢুকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলেও, এখন সামগ্রিক সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে। এ ছাড়া ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবো এলাকাতেও দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকছে না। অনেকে বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার ও এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন।

ভুক্তভোগী গৃহিণীরা জানান, গ্যাসের সরবরাহ এতটাই কম যে সামান্য ভাত রান্না করতেই দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। কাঁঠালবাগানের বাসিন্দা মার্জিয়া আক্তার জানান, দুপুরে দীর্ঘ সময় চুলা জ্বালিয়ে রেখেও তেল গরম করা সম্ভব হয়নি, যার কারণে শিশুর খাবারের জন্য প্রতিদিন বাইরে থেকে কেনা খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মালিবাগের বাসিন্দা মোর্শেদা সেতু জানান, রাত নয়টার পর গ্যাস এলেও শুধু ভাত রান্না করতেই প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগেছে।

এদিকে, সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চালকরা চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না। অনেক পাম্পে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় গ্যাস বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা দৈনিক মাত্র ২০০ টাকার গ্যাস পেয়ে অর্ধেক সময় অলস বসে কাটাচ্ছেন, যার ফলে তাদের আয় কমে গেছে এবং জীবিকা চরম সংকটে পড়েছে। গাবতলীর রাইড শেয়ারিং চালক আশরাফ আলী ও কল্যাণপুরের পাম্পকর্মী ফিরোজ জানান, লাইনে গ্যাস না থাকায় কম্প্রেশার মেশিন চালিয়েও প্রেশার পাওয়া যাচ্ছে না। এই সংকটের কারণে রাস্তায় সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা কমে গেছে এবং ভাড়াও বৃদ্ধি পেয়েছে।

গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে কক্সবাজারের মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কথা বলা হচ্ছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে গেছে। তিতাসের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ মিলছে মাত্র ১৫৫ কোটি ঘনফুটের মতো। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের এই তীব্র স্বল্পচাপ বজায় থাকবে।

বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, ‘লাইনে আমাদের দেওয়ার কথা ১৫ পিএসআই (পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চ) চাপের গ্যাস। সেখানে আমাদের তিন থেকে পাঁচ পিএসআই পর্যন্ত দেওয়া হয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় আমরা কখনো ১০ থেকে ১১ পিএসআই চাপের গ্যাস পাই। এখন গ্যাস একেবারেই জিরো বলা যায়।’ তিনি বলেন, ‘লাইনে ১৫ পিএসআই চাপের গ্যাস থাকলে আমাদের মেশিনগুলো ঘণ্টায় ৫০০ কিউবিক মিটার গ্যাস কমপ্রেস করতে পারে। আর আমরা গাড়িতে গ্যাস ডেলিভারি দেই তিন হাজার পিএসআই প্রেশারে।’

গ্যাস সংকটের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানাতেও। গাজীপুরের প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানার ২০ লাখ শ্রমিক সংকটে পড়েছেন। গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। সাদমা গ্রুপের পরিচালক সোহেল রানা জানান, গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকায় শ্রমিকদের অধিকাংশ সময় বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি রাশিদুল হাসান জানান, কারখানায় উৎপাদন ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিচালক খোরশেদ আলম বলেন, অনেক মিলকারখানা বন্ধের পথে। পরিস্থিতি কত দিন থাকবে তা সরকার স্পষ্ট করলে শ্রমিকদের বসিয়ে না রেখে ছুটি দেওয়া যেত।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল ইলাহী চৌধুরী বলেন, গত আড়াই দশকের অবহেলার কারণে আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিদেশনির্ভর জ্বালানি নীতি বাদ দিয়ে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার ও দ্রুত কূপ সংস্কার করা প্রয়োজন। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০২২ সালের জুলাই থেকে টানা ৭ মাস খোলাবাজারে এলএনজি কেনেনি সরকার, ফলে আমদানিনির্ভরতার এ ঝুঁকি থাকবেই। এদিকে ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো অপচেষ্টা চলছে কি না। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে তেল সংকটের পর দাম বাড়ানোর ঘটনা ঘটেছিল, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ রয়েছে।