কিশোরগঞ্জের ভৈরবে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও সংঘর্ষ এখন আর শুধু নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ফুটবল খেলা দেখা, স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ কিংবা বাজারের নামকরণ নিয়ে সাম্প্রতিক তিনটি সংঘাতের জেরে ট্রেন ও মহাসড়ক বন্ধ হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
এই সংঘর্ষগুলোর বেশির ভাগই হঠাৎ শুরু হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে জানিয়েছেন ভৈরব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আবু মুসা শেখ। কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ঘটনাগুলোর মূল কারণ বড় নয়, কিন্তু পরিণতি ভয়াবহ রূপ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ার কারণেই এমনটা হচ্ছে। অন্যদিকে, ভৈরবের রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন, ক্ষমতার জোর দেখানো, বংশগত পরিচয় বড় করে দেখা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর দাপট দেখানোর মানসিকতাই এসবের পেছনে কাজ করছে। তিনি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের একজোট হয়ে পাড়াভিত্তিক সচেতনতা ও সামাজিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রথমটির সূত্রপাত গত ৪ জুন রাতে ভৈরব পৌরসভার পঞ্চবটি ও জগন্নাথপুর এলাকার তরুণদের ফুটবল খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে। সমর্থকদের কথা-কাটাকাটি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ ভৈরব রেলস্টেশনের দুটি প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-নোয়াখালীসহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে টানা ছয় ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। এতে মহানগর গোধূলী, পারাবত ও এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেসসহ ১০ থেকে ১২টি ট্রেনের প্রায় ৭-৮ হাজার যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে পুলিশের ছয় সদস্য আহত হন। সংঘর্ষের সময় রেলওয়ে থানার গাড়ি ও স্টেশনের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর এবং রেলস্টেশন এলাকার অন্তত ১৫টি দোকানে লুটপাট চালানো হয়, যাতে ব্যবসায়ীদের প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে গত ১০ জুন ভৈরব পৌর এলাকার ভৈরবপুর ও কমলপুর এলাকার লোকজনের মধ্যে। মাইক্রোবাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ একপর্যায়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কে ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যা থেকে রাত দুইটা পর্যন্ত চলা এই সংঘর্ষের কারণে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ব্যস্ততম সড়ক দুটিতে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে এবং কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। এ ঘটনায় ভাঙচুর করা হয় বেশ কিছু গাড়ি এবং পুলিশের তিন সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।
তৃতীয় সংঘর্ষটির নেপথ্যে ছিল একটি বাজারের নামকরণ নিয়ে বিরোধ। ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক ও রেলপথের পাশে অবস্থিত আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের মধ্যে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি সাইনবোর্ড বসানোকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সৃষ্টি হয়। সাইনবোর্ডটিতে শুধু 'আকবরনগর বাজার' লেখা নিয়ে অসন্তোষ থেকে গত ২৭ জুলাই দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাধে। এতে ২ জন নিহত এবং অন্তত ২৫ জন আহত হন। সংঘর্ষের সময় ৪০টি ঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। এই ঘটনার জেরে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে এবং একটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে হয়।
এসব সহিংস ঘটনার পর ভৈরব থানায় মোট পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুটি ঘটনায় তিনটি এবং সর্বশেষ বাজারকেন্দ্রিক সংঘর্ষ ও জোড়া খুনের ঘটনায় দুটি হত্যা মামলা হয়েছে। এই পাঁচ মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে ১০৬ জনকে এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষকে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনাগুলো শেষ পর্যন্ত সামাজিক সমঝোতা বা মীমাংসার মাধ্যমেই শেষ হয়।

