রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি কি আজীবন? যা বলছে বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়মুক্তির সীমা ও স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে আইনি বিতর্ক শুরু হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের সময়ের, তবে কিছু অভিযোগ দায়িত্ব পালনকালীন সময়েরও। অবশ্য এগুলো এখনো উপযুক্ত আদালতে প্রমাণিত হয়নি, কেবল অভিযোগ পর্যায়েই রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রপতির এই বিশেষ দায়মুক্তি কি কেবল তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের জন্য, নাকি এটি আজীবন বহাল থাকে? বাংলাদেশের সংবিধান, অতীতের বিচারিক নজির এবং বিভিন্ন দেশের আইন বিশ্লেষণ করলে এর স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তাঁর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো কাজ করলে বা না করলে সেজন্য তাঁকে কোনো আদালতের কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। তবে এই বিধানের কারণে সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হবে না। সংবিধান ও সরকারের রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী সব সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতির নামে নেওয়া হলেও, কোনো সিদ্ধান্ত দ্বারা কেউ সংক্ষুব্ধ হলে তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন। অন্যদিকে, সংবিধানের ৫১(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো প্রকার ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের বা সচল রাখা যাবে না এবং তাঁকে গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য কোনো আদালত থেকে পরোয়ানা জারি করা যাবে না।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য শব্দবন্ধটি হলো—"রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে"। এর সরল অর্থ হলো, এই ফৌজদারি দায়মুক্তি কেবল ও শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের জন্যই প্রযোজ্য। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো অপরাধ কিংবা রাষ্ট্রপতির পদ থেকে চলে যাওয়ার পর কোনো ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা আর বহাল থাকে না। যদি এটি আজীবন প্রযোজ্য হতো, তবে সংবিধান প্রণেতারা অনুচ্ছেদে "আজীবন" বা "সারা জীবন"-এর মতো শব্দ যুক্ত করতেন। পদ থেকে চলে যাওয়ার পর সাবেক রাষ্ট্রপতিরা প্রটোকল ও নিরাপত্তা পেলেও তা ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো দায়মুক্তি দেয় না। এমনকি পদে থাকাকালীন কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে, পদত্যাগের পর তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যায়। বাংলাদেশে এর বড় নজির সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ক্ষমতা ছাড়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলা হয়েছিল। তিনি হাইকোর্টে দায়মুক্তির দাবি জানিয়ে মামলাগুলো চ্যালেঞ্জ করলেও তা খারিজ হয়। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ 'এইচ এম এরশাদ বনাম রাষ্ট্র (৪৩ ডিএলআর, এডি)' মামলায় রায় দেয় যে, দায়মুক্তি কেবল পদে থাকাকালীন সময়ের জন্যই প্রযোজ্য।

বাংলাদেশের সংবিধানে থাকা এই সাময়িক দায়মুক্তির বিধানটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য একটি বড় প্রতিরোধক (Deterrence) হিসেবে কাজ করে। এটি নিশ্চিত করে যে, সাবেক হওয়ার পর আইনের মুখোমুখি হতে হবে বিধায় দায়িত্ব পালনকালে তাঁরা যেকোনো ফৌজদারি অপরাধে জড়ানো থেকে সতর্ক থাকবেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনকালে যে পরিমাণ সুরক্ষা পান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও তা পান না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর অফিশিয়াল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি পেলেও ব্যক্তিগত অপরাধের ক্ষেত্রে ছাড় পান না। যেমন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন হোয়াইট হাউসের ইন্টার্ন মনিকা লিউইনস্কির সঙ্গে সম্পর্কের জেরে তদন্তের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং তাঁর পদ হারানোর উপক্রম হয়েছিল। আবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও মানহানি মামলায় কোনো দায়মুক্তি কাজ করেনি, যার ফলে তাঁকে বিপুল জরিমানা দিতে হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রপ্রধানদের দায়মুক্তির ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম রয়েছে। ভারতের সংবিধানের ৩৬১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তাঁর অফিশিয়াল কাজের জন্য আদালতের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন এবং পদে থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা যায় না। ফরাসি সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পদে থাকাকালীন কোনো ফরাসি আদালত বা কর্তৃপক্ষের সামনে সাক্ষ্য দিতে বা অভিযুক্ত হতে বাধ্য নন। ব্রিটিশ আইন ব্যবস্থায় ঐতিহাসিক নীতি "The King can do no wrong" (রাজা কোনো ভুল করতে পারেন না) অনুযায়ী রাজপরিবারের প্রধানের বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা করা যায় না। তবে রাশিয়া ও পাকিস্তানের মতো কিছু দেশে সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানদের আজীবন সুরক্ষার বিশেষ বিধান রয়েছে। রাশিয়ায় সাবেক প্রেসিডেন্টরা দায়িত্ব ছাড়ার পর ফৌজদারি বা প্রশাসনিক অভিযোগ থেকে আজীবন দায়মুক্তি পান। পাকিস্তানেও সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও শীর্ষ সেনাপ্রধানদের জন্য বিশেষ আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে চীনের অবস্থা একটু ভিন্ন। চীনের সংবিধানে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট বা আনুষ্ঠানিক আইনি দায়মুক্তি (Legal Immunity) বা আজীবন দায়মুক্তির (Lifelong Immunity) বিধান নেই। তবে ২০১৮ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দুই মেয়াদের সময়সীমা তুলে দেওয়ায় বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অনির্দিষ্টকাল বা আজীবন ক্ষমতায় থাকার পথ সুগম করেছেন। চীনে কার্যত একদলীয় শাসন বিদ্যমান। যদিও চীনের রাজনৈতিক কাঠামোতে নামমাত্র আরও ৮টি ছোট রাজনৈতিক দল রয়েছে, তবে তাদের স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। এই দলগুলো মূলত চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগী বা উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য থাকে। ফলে দেশটির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কার্যত আজীবন আইনি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে অবস্থান করছেন।

অনেকে ভুলবশত রাষ্ট্রপতির এই দায়মুক্তির সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের সাজা বা জেলের প্রসঙ্গ মিলিয়ে ফেলেন, যা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কারও জন্য এমন কোনো দায়মুক্তির বিধান নেই, এটি কেবল রাষ্ট্রপতির জন্যই প্রযোজ্য। বিগত সরকার 'জাতির পিতার পরিবার-সদস্যদের নিরাপত্তা আইন-২০০৯' নামে একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করলেও ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে তা বাতিল করা হয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি কেবল তাঁর কার্যকাল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। পদ ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি সাধারণ নাগরিকের মতোই আইনের মুখোমুখি হতে বাধ্য এবং দায়িত্ব পালনকালে কোনো ফৌজদারি অপরাধে জড়িত থাকলে মেয়াদের পর তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ।

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। কিছু অভিযোগ তার রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ের, তবে বেশির ভাগ অভিযোগ তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের। যতোই গুরুতর হোক এগুলো কেবল অভিযোগ পর্যায়ে। এখনো উপযুক্ত আদালতে (Competent court of law) প্রমাণিত হয়নি। বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে বেশ কিছু দায়মুক্তি দিয়েছে। তবে এই দায়মুক্তির ধরণ, ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, হচ্ছে আলোচনা। রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি কি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের জন্য না স্থায়ী দায়মুক্তি? আমরা এর উত্তর খুঁজবো বাংলাদেশের সংবিধান, অতীতের নজীর ও বিভিন্ন দেশের আইন ও সংবিধান থেকে।

এমনকি রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন সময়ে কোনো ফৌজদারি অপরাধ করলে বা ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে চলে যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যায়। এমন নজীর খোদ বাংলাদেশেই আছে। রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি পদ থেকে চলে যাওয়ার পর অস্ত্র আইনে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলাও হয়েছিল। তিনি হাইকোর্টে দায়মুক্তির কথা বলে ওই মামলাগুলো চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। হাইকোর্ট তার বিরুদ্ধে রায় দিলে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ H M Ershad v State 43 DLR (AD) 50 মামলায় রায় দিয়ে বললেন, “immunity is only available while in office” (অর্থাৎ “শুধুমাত্র পদে থাকাকালীনই দায়মুক্তি পাওয়া যায়”)।