ঢাকার বিভিন্ন স্থানে এবং সাভারের আশুলিয়ায় সম্প্রতি বোমাসদৃশ বস্তু ও শক্তিশালী বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে দুটি স্থানে প্রকৃত ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বা বোমা পাওয়া গেলেও অন্য দুটি স্থানে কোনো বিস্ফোরক মেলেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা, তা খতিয়ে দেখছে।
গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতা থেকে ১ থেকে ১.৫ কেজি ওজনের শক্তিশালী পাইপ বোমা উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোম ডিসপোজাল ইউনিট। সেটি নিষ্ক্রিয় করার সময় এক পথচারী আহত হন। এর মাত্র ছয়দিন পর, ৩০ জুলাই রাতে সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদি দোকানে ট্রাভেল ব্যাগে রাখা টাইমারযুক্ত প্রেসার কুকার আইইডি উদ্ধার করা হয়। অপরদিকে, শনিবার সকালে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ বস্তু দেখে আতঙ্ক ছড়ালেও পরে পরীক্ষা করে দেখা যায় মিরপুরের বস্তুটি ছিল পান-সুপারির কৌটা এবং ফার্মগেটের বস্তায় ছিল স্রেফ পরিত্যক্ত আবর্জনা।
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানান, মতিঝিল ও আশুলিয়ার ঘটনায় জড়িতদের এখনো শনাক্ত করা সম্ভব না হলেও পুলিশ ও সিটিটিসির একাধিক টিম তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর ওপর কড়া গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে এবং যেকোনো নাশকতা মোকাবিলায় সিটিটিসি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। মিরপুর ও ফার্মগেটের ঘটনায় জননিরাপত্তার কোনো হুমকি ছিল না উল্লেখ করে পুলিশ সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া আইইডির নির্মাণকৌশল, বিস্ফোরকের উপাদান ও টাইমিং ডিভাইস বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও সন্দেহভাজনদের গতিবিধিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, দেশে বর্তমানে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছে যারা ঘরে বসেই আইইডি তৈরিতে সক্ষম। সম্প্রতি সাভার, কেরানীগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন উগ্রবাদীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের কেউ কেউ বিদেশে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছিল বলে তথ্য রয়েছে।
এছাড়াও পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও লস্কর-ই-তৈয়বার (এলইটি) সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সম্প্রতি একাধিক ব্যক্তি গ্রেফতার হয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, এই চক্রগুলো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও এনক্রিপটেড অ্যাপের মাধ্যমে গোপনে সদস্য সংগ্রহ করছে, যা ‘স্লিপার সেল’ হিসেবে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, জঙ্গিবাদ এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। বড় হামলা না হওয়া মানেই জঙ্গিবাদ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। উগ্রবাদ রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে বড় কোনো হামলার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই, তবে সম্ভাব্য সব ধরনের নাশকতা ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, যেকোনো উগ্রবাদী তৎপরতা dমণে র্যাব কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং তাদের সাইবার মনিটরিং সার্বক্ষণিক চালু আছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, গুজব প্রতিরোধ এবং প্রকৃত বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোর দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের আইনের আওতায় আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

