ভারতের উত্তর প্রদেশে মুসলিম ঐতিহ্যবাহী ও মুসলিম সদৃশ নামগুলো পরিবর্তন করে হিন্দু পৌরাণিক বা রাজনৈতিক নাম রাখার এক বড় অভিযান শুরু করেছে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও একের পর এক এলাকার নাম বদলে ফেলা হচ্ছে। এই নাম পরিবর্তনকে যোগী আদিত্যনাথ ‘সাংস্কৃতিক গৌরব পুনরুদ্ধারের’ অংশ হিসেবে দাবি করলেও সমালোচকেরা একে ইতিহাস মুছে ফেলার রাজনৈতিক চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
গত বছরের অক্টোবরে লখিমপুর খেরির একটি গ্রামে মরমি কবি সন্ত কবিরের স্মরণে আয়োজিত এক ধর্মীয় সমাবেশে যোগী আদিত্যনাথ জানতে পারেন যে গ্রামটির নাম মোস্তফাবাদ। কিন্তু সেখানে কোনো মুসলিম বাসিন্দা নেই। এই জনতাত্ত্বিক তথ্যটিকেই তিনি নাম পরিবর্তনের প্রধান যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন। সমাবেশে যোগী বলেন, ‘ভেবে দেখুন, আমি যখন এখানে আসি, তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, এখানে কতজন মুসলিম বসবাস করেন? আমাকে বলা হয়েছিল একজনও নয়। কিন্তু এলাকার নাম মোস্তফাবাদ। আমি বললাম, এই নাম এখনই পরিবর্তন করা উচিত। এটি মোস্তফাবাদ নয়, কবির ধাম হওয়া উচিত।’ তিনি আরও দাবি করেন, অতীতে অযোধ্যাকে ফৈজাবাদ, প্রয়াগরাজকে এলাহাবাদ এবং কবির ধামকে মোস্তফাবাদে পরিণত করা হয়েছিল, যা মানুষের পরিচয় মুছে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছিল।
মুখ্যমন্ত্রীর এই সফরের পর তেন্দুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন থাকা মোস্তফাবাদ গ্রামের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব পাস করা হয়। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে এই পরিবর্তনে সম্মত ছিলেন না। তেন্দুয়া গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান অবতার সিং জানান, গ্রামবাসীরা নাম পরিবর্তনের বিরোধিতা করে বলেছিলেন যে এর ফলে ভবিষ্যতে তাঁদের সন্তানদের স্থানান্তরের প্রশংসাপত্র পেতে এবং চাকরি পেতে সমস্যা তৈরি হবে। তাঁরা নাম পরিবর্তনের বদলে এলাকার উন্নয়ন চেয়েছিলেন। অবতার সিং প্রশ্ন তুলে বলেন, স্থানীয় কবির পন্থ আশ্রমের প্রভাব ও স্বয়ং যোগীর জোরালো সমর্থনের জেরে ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর প্রস্তাবটি পাস হয়। সরকারের বিরোধিতা করার ক্ষমতা কারও নেই। অবতার সিংয়ের মতে, ‘মোস্তফাবাগ’ নামের একটি বাগানের নামানুসারে গ্রামটি মোস্তফাবাদ হয়েছিল এবং জানা ইতিহাসে এখানে কোনো মুসলিম বসবাস করেননি। তবে নাম দেখে বোঝা যায় অতীতে নিশ্চয়ই তাঁরা এখানে ছিলেন। বর্তমানে গ্রামটিতে মূলত ওবিসি সম্প্রদায় এবং দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন।
উত্তর প্রদেশে ২০১৮ সালে এলাহাবাদ ও ফয়জাবাদ জেলার নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে প্রয়াগরাজ এবং অযোধ্যা রাখার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে যোগী সরকার বড় শহরের পাশাপাশি ছোট ও তুলনামূলক অপরিচিত জায়গাগুলোর নাম পরিবর্তনের দিকে নজর দিয়েছে, যার অধিকাংশেরই নাম শুনতে মুসলিম নামের মতো। গত ৬ জুলাই মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে শাহজাহানপুর জেলার জালালাবাদ শহরের নাম পরিবর্তন করে ‘পরশুরামপুরী’ রাখা হয়েছে। বিষ্ণুর অবতার ও কুঠারধারী যোদ্ধা দেবতা হিসেবে পরিচিত পরশুরামের নামানুসারে এই নতুন নামকরণ করা হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে পুরোহিত শ্রেণি হিসেবে পরিচিত ব্রাহ্মণদের কাছে পরশুরাম একটি বড় রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রতীক। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতিন প্রসাদও নিজেকে ব্রাহ্মণদের কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় ‘পরশুরামপুরী’ নামের পক্ষে জোর দাবি তুলেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, জালালাবাদ পরশুরামপুরী হিসেবে নতুন সাংস্কৃতিক পরিচয় লাভ করেছে।
কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৫ সালের আগস্টে জালালাবাদের নাম পরিবর্তনের রাজ্য সরকারের প্রস্তাবে অনাপত্তি দিয়েছিল। ১৯১০ সালে ব্রিটিশ কর্মকর্তা এইচ আর নেভিলের লেখা শাহজাহানপুরের একটি গেজেটিয়ার অনুসারে, পুরোনো পাঠান বসতি জালালাবাদ সাধারণত দিল্লির সালতানাতের খিলজি রাজবংশের শাসক জালাল-উদ্দিন ফিরোজের নামে উৎসর্গ করা হয়, যিনি ১২৮৯ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। নেভিল লিখেছিলেন, মোগল সম্রাট জালাল উদ্দিন আকবরের আমলের আগে এ জায়গার নাম জালালাবাদ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর বাসিন্দাদের শাস্তিস্বরূপ শহরটির জনসংখ্যা কিছু সময়ের জন্য কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একসময়ের সমৃদ্ধ এই বাণিজ্যকেন্দ্রটি রেলপথ চালুর পর তার গুরুত্ব হারিয়ে ক্ষয়িষ্ণু রূপ ধারণ করে।
শুধু জালালাবাদ বা মোস্তফাবাদ নয়, গত জুনে কুশীনগরে এক অনুষ্ঠানে যোগী আদিত্যনাথ ঘোষণা করেন যে ফাজিলনগর শহরটি এখন থেকে ২৪তম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের সম্মানে ‘পাভাগড়’ নামে পরিচিত হবে। বক্তৃতাকালে যোগী তাচ্ছিল্যের সুরে প্রশ্ন করেন, ‘আমরা কেন একে ফাজিল ডাকব?’ ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত অবিভক্ত দেওরিয়া জেলার গেজেটিয়ার অনুসারে, মহাবীর প্রায়ই পাভায় (বর্তমান ফাজিলনগর) যেতেন এবং সেখানে তিনি তাঁর শেষ ধর্মোপদেশ দিয়েছিলেন। যোগীর দাবি, মহাবীরের নামের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে মানুষ এখানে আসবে।
গত ১০ জুলাই অযোধ্যায় দাঁড়িয়ে যোগী ঘোষণা দেন, রামের ভাই ভরতের তপস্যার সম্মানে ভাদরসা শহরটিকে এখন ‘ভরত নগর ভরত কুন্ড’ বলা হবে এবং সূচিতাগঞ্জ-খিলোনি নগর পঞ্চায়েতের নাম পরিবর্তন করে ‘মা জাওয়ালা দেবী’ রাখা হবে। এর আগে গত জুনে যোগী ঘোষণা করেছিলেন, মোরাদাবাদের লাইনপার এলাকার নাম সাবেক কংগ্রেস বিধায়ক দাউ দয়াল খন্নার নামে রাখা হবে, যিনি ১৯৮০-এর দশকের রাম জন্মভূমি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত বছর আম্বেদকর নগরের আকবরপুর বাসস্ট্যান্ডের নাম পরিবর্তন করে রামায়ণের চরিত্র শ্রবণ কুমারের স্মরণে ‘শ্রবণ ধাম বাসস্ট্যান্ড’ রাখা হয়।
বর্তমানে বিজেপির একাধিক নেতা ও জনপ্রতিনিধি বিভিন্ন শহরের নাম পরিবর্তনের দাবি তুলছেন। বালিয়ার বিজেপি বিধায়ক কেতকী সিং গাজিপুরের নাম পরিবর্তন করে মহর্ষি গৌতমের নামে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন এবং গাজিপুরের মতো নামকে ‘অপমানের প্রতীক’ বলে উল্লেখ করেছেন। বেরেলির এক বিজেপি বিধায়ক ফরিদপুর শহরের নাম ‘পীতাম্বরপুর’ এবং মে মাসে বিজেপি বিধায়ক নন্দ কিশোর গুর্জর গাজিয়াবাদের নাম পরিবর্তন করে ‘মহারাজা অগ্রসেন নগর’ রাখার দাবি জানান। যোগী আদিত্যনাথ নিজেও অতীতে আকবরপুর ও আজমগড়ের নাম পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম নাম পরিবর্তন করে হিন্দু পৌরাণিক নাম রাখার এই তৎপরতা বিজেপি আরও জোরদার করতে পারে।
মূল শহর কেন্দ্র থেকে এ জায়গায় অবস্থান ১৬-২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।

