সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সতর্ক করে বলেছেন, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিভেদ ও বিরোধ সৃষ্টি হলে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তি পুনরায় উজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তাই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও ভিন্নমত থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। তবে এই ভিন্নমত যেন কোনোভাবেই শত্রুতার রূপ না নেয়, সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে পাখির মতো গুলি করে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং ৩০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বা অন্ধত্ব বরণ করেছেন। সুশাসন ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করা বর্তমান সরকারের পবিত্র कर्तव्य বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা যেত, তবে সরকারই সবার আগে লংমার্চ করত। জনগণকে অযথা উত্তেজিত করার পেছনে অন্য কোনো অপচেষ্টা ছিল কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিদ্যুৎ সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশীয় সোর্স বা বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। পুরো দেশকে আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় গ্যাস আমদানি ব্যাহত হয় এবং একটি এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) দুর্ঘটনায় বিকল হয়ে অতিরিক্ত বিপদের সৃষ্টি করে। তবে সরকার বসে নেই এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংকটের সমাধান করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন。
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ যখনই অবাধে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, তখনই বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি সংকটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তার দল বিএনপি সফলভাবে দেশের হাল ধরেছে। জিয়াউর রহমান দেশকে খাদ্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছিলেন এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া নারী শিক্ষায় বিপ্লব ঘটিয়ে দুই কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছিলেন।
ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে সংসদ নেতা জানান, বিগত সরকার শুধু লুটপাট ও অর্থ পাচারই করেনি, খেলাপি ঋণের হিসাবেও জালিয়াতি করেছিল। ২০২৪ সালে তারা খেলাপি ঋণ দেখিয়েছিল মাত্র ১১ শতাংশ, কিন্তু বর্তমান সরকারের ফরেনসিক অডিটে দেখা যায় প্রকৃত খেলাপি ঋণ ছিল ৩৫.৫ শতাংশ। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে গত ৫ মাসে তা কমে ৩২.6 শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বর্তমান সরকার গত ৫ মাসে রেকর্ড ২ হাজার ৪৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করেছে।
সবশেষে দেশে অবারিত বাকস্বাধীনতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক করে বলেন, বাকস্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে। রাজনীতি থেকে গালাগালির সংস্কৃতি পরিহার করার তাগিদ দিয়ে তিনি জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বলেন, পারিবারিক পরিবেশে যে শব্দগুলো ব্যবহারে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, তা জনপরিসরেও পরিহার করা উচিত। একটি রুচিশীল সমাজ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে সংসদ নেতা বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে গুলি করে পাখির মতো মানুষ হত্যা করা হয়েছে। প্রায় ১৪০০ মানুষ জীবন দিয়েছেন, ৩০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বা অন্ধত্ব বরণ করেছেন। সুশাসন ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য। তাই আসুন, সরকারি বা বিরোধী দল—সবাই মিলে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলি। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’
বিএনপি ক্ষমতায় এলেই দেশকে সংকট থেকে বের করে আনে:যখনই দেশের মানুষ অবাধে ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছে, তখনই তারা বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং বিএনপি ক্ষমতায় এসে প্রতিবারই দেশকে সংকট থেকে বের করে এনেছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি সংকটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি হাল ধরেছে এবং সফল হয়েছে। জিয়াউর রহমান তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে দেশকে খাদ্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছিলেন। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া নারী শিক্ষায় বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন এবং দুই কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালেও বিএনপি দেশকে দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করেছিল।’

