ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে জামায়াত আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। তিনি জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জোরালো দাবি জানান। তিনি বলেন, ৬৮.২ শতাংশ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। শফিকুর রহমানের মতে, আদালত চাইলে যেকোনো আইন বাতিল করতে পারে, কিন্তু গণপরিষদ বা সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করা হলে তা আর বাতিল করা সম্ভব নয়। দেশে যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদী শাসন ফিরে না আসে, সেজন্যই এই রায় বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুর অবস্থার কথা উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ব্যাংকিং খাত ও স্টক মার্কেট—অর্থনীতির এই দুই মূল স্তম্ভই বর্তমানে বিপর্যস্ত। তিনি দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে এসব খাত পরিচালনার আহ্বান জানান। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, মহামান্য প্রেসিডেন্ট নিজেও দুর্নীতির মাত্রা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সব উন্নয়ন পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, কোটা নয়, চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোটা আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজ এর প্রতিবাদ করেছে এবং আমরাও এর সঙ্গে একমত।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেশী হিসেবে আমরা সৎ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। তবে আমাদের দেশের খুনিদের আশ্রয় দেওয়া এবং তাদের রাজনৈতিক অপতৎপরতার সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি সীমান্তে ফেলানীর লাশ দেখতে না চাওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ এখন থেকে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে এবং কারও অধীনতা মেনে নেবে না।
শিল্প ও কৃষি খাতের সংকট নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে পোশাক খাতের উৎপাদন ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিল্প মালিকরা দেউলিয়া হলে ব্যাংক ও অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়বে। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্প খাতকে বাঁচাতে হবে। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধের দাবি জানান তিনি। এছাড়া সংসদে পাস হওয়া ‘সম্পদ হস্তান্তর আইন’ কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে তিনি প্রেসিডেন্টকে এই বিলে সই না করার অনুরোধ জানান এবং বিলটি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আলেমদের দিয়ে পর্যালোচনার প্রস্তাব দেন। পরিশেষে তিনি বলেন, আমরা জাতিকে আর বিভক্ত করতে চাই না এবং সংসদে শালীন ও যৌক্তিক আলোচনার মাধ্যমে নতুন ইতিহাস তৈরি করতে চাই।

