১৯৫৫ সালের ৭ অক্টোবর সান ফ্রান্সিসকোর সিক্স গ্যালারিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সূচনা হয়েছিল। সেদিন অল্প কিছু শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে তরুণ কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ প্রথমবার পাঠ করেছিলেন তাঁর দীর্ঘ, বিদ্রোহী ও নগ্ন কবিতা ‘হাউল’। যুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন সমাজের শৃঙ্খল ও ভদ্রতার মুখোশকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এই কবিতাটি যে একদিন আমেরিকার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে এবং বাক্স্বাধীনতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, তা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। ক্ষুধা, উন্মাদনা, মাদক, প্রেম, শরীর আর অনড় রাষ্ট্রের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে গিন্সবার্গ সেদিন উচ্চারণ করেছিলেন তাঁর অমোঘ লাইন—‘আমি দেখেছি আমার প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ মেধাগুলো উন্মাদনায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’
‘হাউল’ ছিল মূলত বিট জেনারেশনের এক অবাধ্য সন্তান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার কৃত্রিম ভদ্রতা ও শৃঙ্খলকে অস্বীকার করে এই প্রজন্মের তরুণেরা খুঁজে ফিরছিলেন এক ভিন্ন জীবনধারা। জ্যাজের ছন্দ, মদের গ্লাস, যৌন স্বাধীনতা, মাদকাসক্তির অন্ধকার আর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে তাঁরা কবিতার এমন এক ভাষা তৈরি করেছিলেন, যা কোনো সেন্সরশিপের তোয়াক্কা করত না। কিন্তু তৎকালীন শীতল যুদ্ধের আবহে মার্কিন প্রশাসন তখন কঠোর নজরদারির জাল বিছিয়ে রেখেছিল। কে কী পড়ছে, কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে—সবকিছুর ওপর ছিল রাষ্ট্রীয় ও নৈতিকতার সেন্সরশিপ। সমকামিতা ও ভিন্নমতকে সামাজিকভাবে নিপীড়ন করা হচ্ছিল প্রতিনিয়ত।
এই দমবন্ধ করা পরিবেশেই প্রকাশিত হয়েছিল ‘হাউল অ্যান্ড আদার পোয়েমস’। শুরুতে সান ফ্রান্সিসকোর সিটি লাইটস বুকসে বইটির অল্প কিছু কপি পড়ে থাকলেও ১৯৫৭ সালের মার্চে পরিস্থিতি বদলে যায়। ব্রিটেন থেকে আসা বইটির ৫২০টি কপি মার্কিন কাস্টমস বিভাগ অশ্লীলতার অভিযোগে জব্দ করে। এরপর ছদ্মবেশী পুলিশ কর্মকর্তা পাঠিয়ে সিটি লাইটস থেকে বইটি কেনানো হয় এবং দোকানের মালিক লরেন্স ফেরলিঙ্গেট্টি ও ব্যবস্থাপক শিগ মুরাওকে গ্রেপ্তার করা হয়। কবিতাটি তখন সোজাসুজি আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড়ায়। জোনাহ রাসকিনের ভাষায়, এই কবিতার মধ্যে ছিল এক ‘সংক্রামক অবাধ্যতা’, যা আমেরিকার আড়াল করতে চাওয়া অন্ধকার দিকগুলোকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিল।
গিন্সবার্গ এই কবিতাটি লেখা শুরু করেছিলেন ১৯৫৫ সালের ৮ জুন। এক স্বপ্নের পর ঘুম থেকে উঠেই তিনি লিখতে বসেন, যেখানে তাঁর অবচেতন মনে ধরা দিয়েছিলেন ১৯৫১ সালে মেক্সিকোতে মারা যাওয়া বন্ধু জোয়ান ভলমার। ভলমারের স্মৃতির হাত ধরে উঠে এসেছিল সমাজের মূলধারা থেকে ছিটকে পড়া অসংখ্য বন্ধু, প্রেমিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের মুখ। গিন্সবার্গ নিজেও মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছেন; ১৯৪৯ ও ১৯৫০ সালে টানা আট মাস তিনি নিউইয়র্ক স্টেট সাইকিয়াট্রিক ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর মা এবং দীর্ঘদিনের সঙ্গী পিটার অরলভস্কিও মানসিক অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। ফলে ‘হাউল’-এর উন্মাদনা কোনো কাল্পনিক বিষয় ছিল না, এটি ছিল ভেতর থেকে উঠে আসা এক দহন।
কবিতাটিতে বারবার ফিরে এসেছে ‘মোলোখ’ নামের এক প্রতীক। গিন্সবার্গের কাছে মোলোখ ছিল পুঁজিবাদ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সামরিক-শিল্প কাঠামো, অর্থের লোভ আর মানুষের আত্মাকে যন্ত্রে পরিণত করা এক সভ্যতা। এই দানবীয় ব্যবস্থার সামনে মানুষের প্রেম, স্বপ্ন ও কবিতা কীভাবে ছোট হয়ে যায় এবং কারখানা, যুদ্ধ ও বিজ্ঞাপন কীভাবে বড় হয়ে ওঠে, তা-ই ফুটিয়ে তুলেছিলেন কবি। এই শোষণের বিরুদ্ধে ‘হাউল’ ছিল এক তীব্র চিৎকার, যা জ্যাজের ছন্দের মতো কিংবা হাঁপিয়ে ওঠা মানুষের শ্বাসের মতো এক বাঁধভাঙা ভাষায় গর্জে উঠেছিল।
১৯৫৭ সালের ১৬ আগস্ট শুরু হয় লরেন্স ফেরলিঙ্গেট্টি ও শিগ মুরাওয়ের ঐতিহাসিক বিচার। রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, এই কবিতার কোনো সামাজিক ارزش বা মূল্য নেই এবং এটি তরুণদের বিপথগামী করছে। অন্যদিকে ডিফেন্সের পক্ষে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন দাঁড়ায় এবং নয়জন বিশিষ্ট পণ্ডিত ও অধ্যাপক আদালতে এসে কবিতাটির সাহিত্যিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। বিচার চলাকালে গিন্সবার্গ নিজে ইউরোপ ও দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকলেও তাঁর কবিতা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে ৩ অক্টোবর ১৯৫৭ সালে বিচারক ক্লেটন হর্ন রায় দেন যে, ‘হাউল’ অশ্লীল নয়। তিনি বলেন, কোনো সাহিত্যকর্মের সামগ্রিক অর্থ ও সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনা না করে কেবল কয়েকটি শব্দ দিয়ে তাকে বিচার করা যায় না।
এই রায়ের পর ‘হাউল’ বিশ্বজুড়ে এক সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণ ঘটায় এবং বইটির প্রায় ১০ লাখ কপি বিক্রি হয়। এই আইনি বিজয় ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’, ‘ট্রপিক অব ক্যান্সার’ এবং ১৯৬২ সালে গ্রোভ প্রেস থেকে প্রকাশিত বারোজের ‘নেকেড লাঞ্চ’-এর মতো বিতর্কিত বইগুলোর মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে দেয়। হলিউডের সিনেমাতেও নিষিদ্ধ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার সাহস তৈরি হয়। বিটনিক, হিপস্টার ও হিপ্পি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ষাটের দশকে এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায়। বব ডিলান থেকে শুরু করে বহু শিল্পী গিন্সবার্গ দ্বারা প্রভাবিত হন। ১৯৬৯ সালে ‘শিকাগো সেভেন’-এর বিচারে সাক্ষী হিসেবে এসেও গিন্সবার্গ আদালতে এই কবিতার অংশবিশেষ পাঠ করেছিলেন। ‘হাউল’ প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্র যখনই শব্দকে বন্দি করতে চায়, কবিতা তখনই নীরবতার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে।

