নারায়ণগঞ্জে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং, খুন-চাঁদাবাজির নেপথ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়

নারায়ণগঞ্জ জেলা জুড়ে শহর থেকে শহরতলী এবং পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে গলিপথে দীর্ঘ দিন ধরে চলছে কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া তৎপরতা। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মোটরসাইকেল মহড়া, প্রকাশ্যে ছুরি ও চাপাতি প্রদর্শন, মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এই উঠতি বয়সীরা। এমনকি তুচ্ছ ঘটনায় হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মতো ভয়ঙ্কর অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, জেলার প্রায় প্রতিটি থানা এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকার পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে ছোট ছোট কিশোর গ্যাং বা সন্ত্রাসী গ্রুপ, যেগুলোর রয়েছে নিজস্ব নাম, নেতৃত্ব ও সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রিত এলাকা। নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে প্রায়ই এরা অন্য গ্রুপের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে।

এসব গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করা স্থানীয় সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, আড্ডা কিংবা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই তাকে হুমকি, মারধর ও নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, কিশোর পরিচয়ের আড়ালে এই তরুণদের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে পেশাদার অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। শুরুতে আড্ডা, মোটরবাইক মহড়া বা ছোটখাটো মারামারি দিয়ে অপরাধের হাতেখড়ি হলেও, সময়ের ব্যবধানে তাদের হাতে উঠে আসছে চাপাতি, ছুরি ও লোহার পাইপের মতো মারাত্মক সব দেশীয় অস্ত্র।

কিশোর অপরাধের এই ভয়ঙ্কর রূপের চিত্র উঠে আসে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফতুল্লার ইসদাইর এলাকায় প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন নাহিয়ান আজম ইভন নামে এক তরুণ। নিহত ইভনের বিরুদ্ধে হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ইভটিজিং ও কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে একাধিক মামলা ছিল এবং পূর্বে তাকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের তথ্যও রয়েছে। এছাড়া, গত ১৯শে আগস্ট রাতে বন্দরের পশ্চিম এলাকায় শেখ সিফাত বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ইসলামী আন্দোলনের বন্দর পশ্চিম শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদ আলামিন বুলবুলকে। এই হত্যাকাণ্ডের পর বাহিনীর প্রধান সিফাতসহ ১১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হলেও গ্যাংয়ের বাকি সদস্যরা এখনো অধরা রয়ে গেছে। অন্যদিকে, গত ৩০শে আগস্ট বিকালে ফতুল্লার পিটিআই লালখা এলাকায় চাঁদার দাবিতে কিশোর গ্যাং লিডার ফয়সাল ও তার সহযোগী আকাশের নেতৃত্বে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে এলাকায় চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েই এই কিশোররা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বিগত সরকারের আমলে তথাকথিত 'বড় ভাইরা' এসব গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতো। মিছিলে লোক সমাগম বাড়ানো এবং নিজেদের political বলয় ভারী করতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতা এসব গ্রুপকে আশ্রয় দিতেন। গত ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আশ্রয়দাতারা পালিয়ে গেলেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এলাকায় বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী র‌্যাব ও পুলিশ বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে এদের গ্রেপ্তার এবং অস্ত্র উদ্ধার করলেও, জামিনে বেরিয়ে এসে তারা পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। ফলে শুধু গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার নয়, বরং তাদের নেপথ্যের মূল নিয়ন্ত্রক, অর্থদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী ও আশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি উঠেছে।

এই সামাজিক ব্যাধি দূর করতে কিশোরদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। খেলাঘর নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি জহিরুল ইসলাম জহির এ প্রসঙ্গে বলেন, শুধু প্রশাসনিক বা পুলিশি তৎপরতা দিয়ে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর পেছনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি কিশোরদের সুস্থ ও ইতিবাচক মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার বিকল্প বিনোদন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সম্মিলিতভাবে এই দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, কিশোর গ্যাং হঠাৎ করে গড়ে ওঠে না; এর পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের অংশ হিসেবে কিশোরদের ব্যবহার করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করা হয়। পুলিশ প্রশাসন এসব জানলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয় না। তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় বন্ধের পাশাপাশি কিশোরদের জন্য শিক্ষা, পাঠাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানান। নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, কেবল বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বরং কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর মূল কারণ, নেপথ্যের মদদদাতা এবং অপরাধের অর্থনৈতিক কাঠামো ধ্বংস করতে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে নারায়ণগঞ্জ আবার একটি নিরাপদ জনপদে পরিণত হয়।