সারা দেশে ৫৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে তেলের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক তেলভিত্তিক কেন্দ্র এখন তেলশূন্য হয়ে অলস বসে আছে। এই সংকটময় পরিস্থিতির কারণে তেলভিত্তিক এই ৫৩টি কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে, যা সারা দেশে লোডশেডিংকে ভয়াবহ আকার দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গড়ে ৭-৮ দিনের বেশি ফার্নেস অয়েল মজুত নেই, অথচ স্বাভাবিক সময়ে কমপক্ষে ১৫ দিনের মজুত থাকার কথা। এর ফলে সান্ধ্যকালীন পিক আওয়ারে শুধু তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালানো হচ্ছে। দেশের ৫৩টি তেলভিত্তিক কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৫ হাজার ৪৬২ মেগাওয়াট হলেও মঙ্গলবার দুপুর ২টায় এসব কেন্দ্র থেকে মাত্র ১ হাজার ৬৯৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, একটি ভাসমান টার্মিনাল বন্ধ থাকায় দেশে গ্যাস উৎপাদন কমে গেছে, যার ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আগের চেয়ে কম গ্যাস পাচ্ছে। এর ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যোগ হয়েছে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে ফার্নেস অয়েল বা ডিজেলের মজুত তলানিতে নেমে আসার ঘটনা। মূলত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) এবং অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে পিডিবির ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া পাওনা রয়েছে। বিল না পাওয়ায় বেশির ভাগ আইপিপি তাদের কেন্দ্রের জন্য তেল কিনতে পারছে না। পিডিবির একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এরপরও কখনো কখনো ৩৫০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। সরকার গত ৩-৪ বছর ধরে আইপিপিসহ বিভিন্ন কোম্পানির বকেয়া বিল দিতে পারছে না বলে অনেক আইপিপি বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছে। এতে জনগণ বিদ্যুৎ না পেলেও রাষ্ট্র ঠিকই কোম্পানিগুলোকে বিল পরিশোধ করছে।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন-বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাত সোমবার জানিয়েছেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ৬-৭ মাসের বিল বকেয়া রয়ে গেছে পিডিবির কাছে। টাকা না পেলে কোম্পানিগুলো কীভাবে তেল কিনবে বা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। প্রতিবছর সরকার বিভিন্ন কোম্পানিকে ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়, যার মধ্যে তেলভিত্তিক কোম্পানিগুলোই ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পায়।
৩০ জুলাই পর্যন্ত ৫১টি তেলভিত্তিক কেন্দ্রের মজুত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক কেন্দ্রে ২-৩ দিনের বেশি তেল নেই। পিডিবির তিতাস ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্রে মজুত আছে মাত্র ১২৬ টন ফার্নেস অয়েল, যা দিয়ে একদিনও কেন্দ্র চালানো সম্ভব নয়। পিডিবির ১০টি তেলভিত্তিক কেন্দ্রের মধ্যে ভেড়া ৭০ মেগাওয়াট কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ১১৮ টন তেল মজুত ছিল, যা দিয়ে প্রায় ১২ দিন চলবে। সরকারি-বেসরকারি খাতে থাকা ৪৩টি কেন্দ্রের মধ্যে গাজীপুর ১০২ মেগাওয়াট কেন্দ্রে এক ছটাক তেলও নেই, অথচ কেন্দ্রটিকে বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। আরপিজিসিএলের গাজীপুর ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ৪৫২ টন তেল থাকলেও গাজীপুর ৩২ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ১২ দিনের তেল মজুত আছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুলাই পর্যন্ত ইপিভি ঠাকুরগাঁও ১১৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ৫ হাজার ১৬২ টন তেল ছিল, যা দিয়ে ১৮ দিন চালানো যাবে। এছাড়া বারাকা শিকলবাহা ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ১৭ দিন এবং বারাকা পতেঙ্গা ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ১৫ দিন চলার মতো তেল আছে। সব মিলিয়ে ৫৩টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ১০টিতে ১০ দিনের বেশি তেল মজুত আছে। এছাড়া ৫টি কেন্দ্র একেবারেই তেলশূন্য এবং ১০টি কেন্দ্রে একদিন চালানোর চেয়েও কম তেল মজুত রয়েছে।
সারা দেশে গতকাল বৃষ্টি হওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমেছে, যার ফলে লোডশেডিংয়ের তীব্রতাও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবে উৎপাদন বাড়েনি। মঙ্গলবার বেলা ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫৩৯ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ করা গেছে ১৩ হাজার ২৫৫ মেগাওয়াট। এই সময়ে ২ হাজার ২৮৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।

