২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব কেবল একটি আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি। এই অভ্যুত্থান সফল করার পেছনে আলেম সমাজ ও ইসলামপন্থীদের ত্যাগ, রক্ত ও জীবনের নজরানা ছিল অনন্য। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যে ঘটনার পেছনে যাদের শ্রম ও কোরবানি বেশি, সেই অর্জিত ফলের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতাও বেশি থাকে। এই মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের সেই ঐতিহাসিক ঈমানী জাগরণের মাধ্যমে, যা ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিরোধ।
২০১৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে আলেম সমাজ অকাতরে ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বিশেষ করে ২০২১ সালে ভারতের আধিপত্যবাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর বিরোধী আন্দোলনের সময়কার রাষ্ট্রীয় জুলুম, কারাবাস ও অমানুষিক নির্যাতনের ইতিহাস আলেম সমাজের ত্যাগের এক অবিস্মরণীয় দলিল। জুলাই মাস জুড়ে রাজপথে হাজার হাজার ছাত্র, শিক্ষক ও নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ এবং রক্তদান প্রমাণ করে যে, এই বিপ্লবের চেতনা রক্ষা ও বাস্তবায়নে আলেম সমাজ কতটা আপসহীন।
এই বিপ্লব আলেম সমাজের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে। বিগত অর্ধ শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল ১৯৭২ সালের ধর্মনিরপেক্ষ ও ভারত-নির্ভর সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে, যা ইসলামপন্থীদের কোণঠাসা করে রেখেছিল। জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে কিছু পরিবর্তন আনলেও, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে সেই ইসলামবিদ্বেষী বন্দোবস্ত আরও শক্তিশালী হয়। এখন জুলাই সনদের ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠিত হলে ইসলামপন্থীরা দীর্ঘদিনের এই নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারে।
জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের চেতনাও নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ৭২-এর ধর্মনিরপেক্ষ বয়ানে এই অধ্যায়কে নিষিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার যে ঐতিহাসিক আন্দোলন, সেখানে দেওবন্দী আলেমদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল। শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী ও আল্লামা যফর আহমদ উসমানীসহ অনেক আলেম দেশভাগের পর স্বাধীন ভূখণ্ডের পতাকা উত্তোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আজ ১৯৪৭, ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের চেতনার ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে দাবি উঠেছে, তা আলেম সমাজের আদর্শিক অবস্থানের জন্য অপরিহার্য।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় দলগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর ক্ষেত্রেও জুলাই বিপ্লব একটি ভারসাম্যপূর্ণ সুযোগ এনেছে। বিএনপির মতো দলগুলো তাদের রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নে অনাগ্রহী, কারণ এটি তাদের নেতৃত্বের ব্যর্থতাকে পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেয়। তবে আলেম সমাজের একটি অংশ যারা এখনো ৪৭-পূর্ববর্তী অখণ্ড ভারতের রাজনৈতিক চেতনা বা হীনমন্যতায় ভুগছেন, তাদের অবস্থানকে আত্মঘাতী বলে মনে করা হয়। দেশভাগের পর সেই বিতর্কের আর কোনো যৌক্তিকতা নেই। এখন সময় এসেছে জুলাই বিপ্লবের এই সফলতাকে কাজে লাগিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র ও ইনসাফপূর্ণ শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে জোরালো করার।

