জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে সারা দেশে দায়ের করা হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ৮৮ শতাংশ মামলাই এখনো তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক তদন্তাধীন এসব মামলার একটি বড় অংশ সাক্ষী ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে ঝুলে আছে। পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের পর সারা দেশে মোট ৮০১টি হত্যা মামলা এবং ১ হাজার ৬৪টি হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য অভিযোগের মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩১ জন। গত দুই বছরে মাত্র ২৫৯টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যা মোট মামলার ১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, প্রতিটি ঘটনায় একাধিক মামলা হওয়া, মামলায় নামহীন ও অজ্ঞাত আসামির আধিক্য এবং ঘটনাস্থলে সিসিটিভি ফুটেজের অভাব তদন্তকে দীর্ঘায়িত করছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসী বা মৃত ব্যক্তিদের নাম আসামির তালিকায় থাকায় প্রকৃত দায় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্ট, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হয়েছে। অনেক সাক্ষীই এখন ভয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না অথবা এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। পিবিআই’র পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, এজহারে উল্লিখিত অনেক ঘটনাস্থলের সাথে ভিকটিমের উপস্থিতির তথ্যের গরমিল পাওয়া যাচ্ছে, যা মামলা তদন্তে বাড়তি সময় নিচ্ছে।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা মিরাজুল ইসলাম অর্ণবের মৃত্যুর ঘটনাটি এর একটি উদাহরণ। ১৯শে জুলাই বসিলা ব্রিজের ঢালে গুলিতে নিহত হওয়ার পর তার মা অজ্ঞাতনামা শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেন। পিবিআই শ্যামলী অফিসের পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম জানান, এই মামলায় সব আসামি অজ্ঞাত হওয়ায় এবং ঘটনার কোনো ভিডিও ফুটেজ না পাওয়ায় তাদের শনাক্ত করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। একই দিনে বসিলা ব্রিজের নিচে নিহত মো. মনসুরের হত্যা মামলার তদন্তও দেড় বছর ধরে ঝুলে আছে।
ঢাকার আদালত ও বিভিন্ন থানায় দায়ের করা ৭৮৯টি মামলার মধ্যে ২১শে জুলাই পর্যন্ত পুলিশ মাত্র ৩৭টি মামলার প্রতিবেদন জমা দিতে পেরেছে, যার মধ্যে ২৮টি হত্যা মামলা। মহানগর আদালতে মাত্র দুটি মামলার অভিযোগ গঠন হয়েছে। অন্যদিকে পিবিআই ২০৮টি মামলার তদন্ত শেষ করেছে, যার মধ্যে ৭১টি এখনো তদন্তাধীন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কিছু মামলার বিচার চললেও অধিকাংশ মামলার বিচার শুরু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। পাবলিক প্রসিকিউটর মো. ওমর ফারুক ফারুকী জানিয়েছেন, সমন্বয়হীনতার কারণে কিছু মামলায় নির্দোষ ব্যক্তি আসামি হয়েছেন, আবার দোষীরা বাদ পড়েছেন। দ্রুতই এসব মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার জন্য অভিযোগ গঠনের আর্জি জানানো হবে।

