মুসলিম বিশ্বের কাছে আরব আমিরাত কেন এক প্রশ্নবিদ্ধ রাষ্ট্র?

২০০১ সালের নভেম্বরে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর, বাংলাদেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের তালিকায় আরব আমিরাত ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। তৎকালীন সময়ে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী রাষ্ট্র হিসেবে আমিরাতের কাছ থেকে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রত্যাশা ছিল। সেই সুবাদে প্রিন্স মুবারক আল নাহিয়ানকে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তার সেই সফরের ফলস্বরূপ ওয়ারিদ টেলিকম বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। তবে ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের বিদায়ের পর অন্যান্য লাভজনক খাতে ধাবি গ্রুপের বিনিয়োগের পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হয়নি। সময়ের পরিক্রমায় ওয়ারিদ টেলিকমও তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়।

বিনিয়োগ বোর্ডের দায়িত্ব পালনকালে আমি তিনবার আমিরাত সফর করেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, দুবাই শহরটি ভারতীয়দের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে এবং আবুধাবিতেও ভারতীয় প্রভাব বাড়ছে। সময়ের সাথে সাথে এই পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে এবং বর্তমানে আমিরাতকে ইসরাইল ও ভারতের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে। গণতন্ত্রহীন ইউএই জনমতের তোয়াক্কা না করে যেভাবে এই দুই দেশের অন্যায় কর্মকাণ্ড সমর্থন করছে, তা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতেও সম্ভব নয়।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে আমিরাতের অবস্থান অত্যন্ত বিতর্কিত। ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তাদের আমিরাত সফর, আকাশ সুরক্ষায় ইসরাইলি আয়রন ডোমের ব্যবহার এবং মার্কিন-ইসরাইলি বিমান ঘাঁটি হিসেবে আমিরাতের ভূমি ব্যবহার মুসলিম বিশ্বের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, হাজার বছরের শিয়া-সুন্নি বিভেদকে পুঁজি করে মুসলিম উম্মাহর স্বার্থবিরোধী খেলায় মেতেছে দেশটির শাসক পরিবার। পাকিস্তান যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানানোয় তাদের ওপর কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের চাপ প্রয়োগ করেছে ইউএই।

বাংলাদেশের সাথে আমিরাতের সম্পর্ক মূলত জনশক্তি রপ্তানি কেন্দ্রিক। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি সেখানে কর্মরত এবং দেশটি থেকে বছরে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে, যা মোট রেমিট্যান্সের ৯০ শতাংশেরও কিছু বেশি। তবে ভারতের সাথে আমিরাতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার কারণে ভবিষ্যতে পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি কর্মীদের সরিয়ে ভারতীয়দের অধিক হারে নিয়োগ দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের নির্বাচনে বাংলাদেশের পরিবর্তে ইসরাইলের মিত্র সাইপ্রাসের পক্ষে ভোট দেওয়া এবং জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে পলাতক অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়ার ঘটনাগুলো দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে। বেনজীর আহমেদের মতো ব্যক্তিদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশের অনুরোধ উপেক্ষা করা এবং ভারত-আমিরাত যৌথ সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। আমিরাতের শ্রমবাজারের ৪০ শতাংশই এখন ভারতীয়দের দখলে এবং সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৫ শতাংশই বর্তমানে নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।