শিক্ষকতা ও নাট্যমঞ্চ থেকে বঙ্গভবন: রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য পথপরিক্রমা

ষাটের দশকের অগ্নিগর্ভ ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক জীবনের পাঠ নিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি আজ বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা যেন কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। ঠাকুরগাঁওয়ের অবহেলিত এক জনপদ থেকে উঠে এসে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হওয়া এই নেতার জীবন নানা বৈচিত্র্য ও সাফল্যে ভরা।

মির্জা ফখরুলের রাজনীতির ভিত্তিভূমি ছিল ঠাকুরগাঁও, যেখানে তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিনও রাজনীতি করেছিলেন। তাঁদের আদি নিবাস পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুরে, যা তাঁদের বিখ্যাত মির্জা বংশের নামানুসারেই নামকরণ করা হয়েছে। এই বংশেরই সন্তান সাবেক স্পিকার ও মন্ত্রী মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ। ফলে মির্জা ফখরুলকে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও—এই দুই হিমালয় দুহিতারই ভূমিপুত্র বলা চলে। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি এখনো অত্যন্ত জনপ্রিয়। শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার প্রায় ৪০ বছর পরও ঠাকুরগাঁওয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তিনি ‘স্যার’ হিসেবেই সমাদৃত। এই সম্বোধন কোনো ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে নয়, বরং স্থানীয় মানুষের গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা থেকে এসেছে। ২০০১-০৬ পর্যন্ত যখন দুটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম, তখন অতিথি হয়ে এলাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আসতেন। তিনি যখন স্থানীয় ভাষায় বলতেন, ‘তোমরা ভয় পাবেন নাই, মুই তো আছু’, তখন একজন জাতীয় নেতার চেয়ে তাঁর ভূমিপুত্রের মাটিঘেঁষা আন্তরিক রূপটিই বেশি ফুটে উঠত।

রাজনীতির বাইরে মির্জা ফখরুলের একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন ছিল। ঠাকুরগাঁও কলেজে পড়ার সময়ে তাঁর ছাত্ররা তাঁকে ‘আলমগীর স্যার’ হিসেবে ক্লাসের বাইরে নাটকের মঞ্চে অভিনয়, সংলাপ প্রক্ষেপণ ও কবিতা আবৃত্তির জন্য স্মরণ করেন। স্কুলজীবনে ফণীন্দ্রভূষণ পালিতের কাছে নাটকের হাতেখড়ি হওয়ার পর তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি নাট্যনির্দেশনাও দিয়েছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের মঞ্চে তাঁর নির্দেশিত ও অভিনীত ‘অন্ধকারের নিচে সূর্য’, ‘ফিঙ্গার প্রিন্ট’, ‘চারিদিকে যুদ্ধ’ এবং ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বিশেষ করে, সিরাজউদ্দৌলা নাটকে আনোয়ার হোসেনের সিরাজের বিপরীতে রবার্ট ক্লাইভ চরিত্রে মির্জা ফখরুলের অভিনয় আজও প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরে। প্রখ্যাত চিত্রনায়ক আবদুর রহমান ছিলেন তাঁর মামাতো ভাই, যাঁর সঙ্গে তিনি একই মঞ্চে অভিনয় করেছেন।

ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (ভাসানীপন্থী মেনন গ্রুপ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি ছিলেন মির্জা ফখরুল। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানকালে তিনি কারাবরণ করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি সরকারি চাকরির নিশ্চিত সুবিধা ও মায়া কাটিয়ে আবার রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথে ফিরে আসেন। ১৯৮৬ সালে পুনরায় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শেষভাগে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হলেও ২০০১ সালে তিনি জয়ী হন এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন এবং স্থানীয় সরকার (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৮ সালে দলের ভরাডুবির সময়েও তিনি অত্যন্ত অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন।

বিগত দেড় দশকে দেশের গভীর রাজনৈতিক সংকটে মির্জা ফখরুল সম্মুখসারির নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ২০১১ সালে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর খালেদা জিয়ার কারাবাস ও তারেক রহমানের প্রবাসে থাকার কঠিন সময়ে তিনি বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন। এই দীর্ঘ সংগ্রামে তিনি নিজে ১১ বার কারাবরণ করেছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েও কারচুপির প্রতিবাদে তিনি শপথ নেননি। ফলে সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ছিল মাত্র সাড়ে পাঁচ বছরের। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পথপরিক্রমা যদি আওয়ামী লীগ বিগত দেড় দশকে জটিল না করে তুলত, তাহলে মির্জা ফখরুল হতেন একজন নিয়মিত পার্লামেন্টারিয়ান।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও এর পরবর্তী দুই বছরে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণেও তাঁর অগ্রণী ভূমিকা জাতীয়ভাবে অনস্বীকার্য। সম্প্রতি গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের নানা চেষ্টা হলেও বিএনপি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। এই ক্রান্তিকালে মির্জা ফখরুলের বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা দেশকে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট থেকে রক্ষা করেছে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ার পরও বিএনপি তাড়াহুড়ো না করে রাষ্ট্রপতিকে সম্মানজনক বিদায়ের সুযোগ করে দিয়েছে। ২০৩১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া এবং ২০৩১ সালের আগস্ট পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ থাকা—সব মিলিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচনে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুলের মতো একজন পরীক্ষিত ও প্রাজ্ঞ রাজনীতিকের বিকল্প ছিল না।

ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল অত্যন্ত সরল ও প্রটোকলহীন জীবন পছন্দ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতের বিহারের মুখ্যমন্ত্রী কর্পূরী ঠাকুরের প্রটোকলহীন সাধারণ জীবনযাত্রা দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। নির্বাচনের আগে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে এটিই হবে তাঁর শেষ নির্বাচন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাঁর ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। মাঠের রাজনীতি থেকে তাঁর এই প্রস্থান দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করলেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল।